দেশে সারের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রীয় তিনটি সার কারখানা আগামী নভেম্বরের মধ্যেই পুনরায় চালুর জোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এর পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা সার কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ এবং সম্পূর্ণ নতুন আধুনিক কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে বার্ষিক সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।
সরকারি এই সংস্থাটি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করছে যে, সময়োপযোগী এই উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদেশ থেকে সার আমদানির বিশাল ব্যয় বহুগুণ হ্রাস পাবে, জাতীয় রিজার্ভের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের কৃষকদের চাহিদা ও মৌসুম অনুযায়ী সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সুনিশ্চিত করা অনেক বেশি সহজ হবে।
বিসিআইসির উচ্চপর্যায়ের সূত্র থেকে জানা গেছে, সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণাধীন মোট সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চারটি চালু রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের তীব্র সংকটের কারণে বেশ কিছু দিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড (টিএসপিএল) ও ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)। সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে থাকা এসব কারখানা দ্রুত পুনরায় চালু করতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি মেরামতকাজ সম্পন্ন করার দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিসিআইসির সম্মানিত চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন পুনরায় শুরু করার প্রধান শর্ত হলো সেখানে নিরবচ্ছিন্ন এবং নির্ধারিত চাপে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, চট্টগ্রামভিত্তিক টিএসপি ও ডিএপি কারখানার স্থগিত উৎপাদন শুরু করতে হলে মৌলিক কাঁচামালের নিয়মিত জোগান সুনিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান এসব জটিলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক প্রশাসনিক যোগাযোগ ও গভীর সমন্বয় অব্যাহত রাখা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহ পাওয়া মাত্রই আগামী নভেম্বরের মধ্যেই কারখানা তিনটি পুনরায় চালু করার বিষয়ে আমরা পূর্ণ আশাবাদী।’
আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর এই বিশেষ পরিকল্পনা দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদনকে সচল ও টেকসই রাখতে অত্যন্ত জরুরি। কারণ ফসল ফলানোর মৌসুমে সারের সুষম সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পুরোটা এতদিন দেশীয় উৎপাদন থেকে মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বিদেশ থেকে প্রচুর সার আমদানি করতে হতো সরকারকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বন্ধ কারখানাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চালু করা এবং উৎপাদনক্ষম কারখানাগুলোর কাজের গতি বাড়ানোকে বিসিআইসি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বিসিআইসির সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সার কারখানাগুলোতে সর্বমোট ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৬৮ হাজার ২৫৯ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন ডিএপি সার উৎপাদিত হয়েছে।
অথচ একই অর্থবছরে সমগ্র দেশে এককভাবে ইউরিয়া সারের জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন। সেই হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোতে উৎপাদিত ইউরিয়া দিয়ে মোট জাতীয় চাহিদার মাত্র ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছিল। অন্যদিকে, কৃষি জমিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎপাদনের অবদান ছিল যথাক্রমে মাত্র ৯ দশমিক ১০ এবং ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
উৎস থেকে প্রাপ্ত এই হতাশাজনক পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, বিশেষ করে ফসফেটজাত সারের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা টিএসপি ও ডিএপি কারখানা দুটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হলে এই দুই ক্যাটাগরির সারের স্থানীয় উৎপাদন একলাফে বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে বাস্তব উৎপাদন কতটা বৃদ্ধি পাবে, তা মূলত কারখানাগুলোর প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা, কাঁচামালের পর্যাপ্ততা এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনার ওপর নির্ভর করবে।
এ ব্যাপারে বিসিআইসি প্রধান মো. বাবুল মিঞা উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশের বাৎসরিক সার চাহিদার একটি বড় অংশ এখনো ব্যয়বহুল আমদানির মাধ্যমেই মেটাতে হয়। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৪৪ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৯ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর নিজস্ব উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক আমদানির ওপর আমাদের এই চরম নির্ভরতা কমবে, মহামূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ হবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের দরজায় সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘দেশের বন্ধ ও চালু থাকা সব সার কারখানা পুরোদমে সচল করে কেবল ইউরিয়া সার আমদানি খাত থেকেই প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।’
বিসিআইসি সূত্রে জানা যায়, নভেম্বরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদন শুরুর প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো নির্ধারিত চাপে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ পাওয়া। এই বিষয়ে পেট্রোবাংলাসহ গ্যাস সরবরাহকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিসিআইসির উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং সরবরাহকারী সংস্থাগুলো খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে নীতিগত আশ্বস্ত করেছে।
অপরদিকে, প্রয়োজনীয় দ্রবণীয় ফসফরিক অ্যাসিডের চরম ঘাটতি এবং প্রধান সালফিউরিক অ্যাসিড প্ল্যান্ট সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় টিএসপি কমপ্লেক্সের নিয়মিত উৎপাদন আটকে ছিল। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং প্ল্যান্টের যান্ত্রিক মেরামত সম্পন্ন হলেই কারখানাটি উৎপাদনে ফিরবে। একইভাবে ডিএপি কারখানার কার্যক্রমও মূলত কাঁচামাল ফসফরিক অ্যাসিডের অপ্রতুলতার কারণে থমকে গিয়েছিল।
বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই টিএসপি ও ডিএপি উভয় কারখানার বাণিজ্যিক উৎপাদন পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। তবে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও কাঁচামাল প্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়াই এখানে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
সার কারখানাগুলো বছরের পর বছর সফলভাবে সচল রাখার স্বার্থে কেবল গ্যাস ও রাসায়নিক কাঁচামালের সহজলভ্যতাই শেষ কথা নয়, বরং কারখানাগুলোর শতভাগ যন্ত্রপাতির কর্মক্ষমতা বজায় রাখা, নিয়মিত টেকনিক্যাল রক্ষণাবেক্ষণ এবং সামগ্রিক উৎপাদন কাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞ মহলের মতে, স্রেফ কারখানা খুললেই চলবে না, বরং উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক গ্যাস হলো ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান ও মৌলিক উপাদান। ফলে গ্যাসের নির্ধারিত চাপ বা সংকট দেখা দিলে ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। একইভাবে টিএসপি ও ডিএপি কারখানা সচল রাখতেও বিদেশি কেমিক্যাল ও প্রসেসড কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন জোগান আবশ্যক। এই গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় নিশ্চিত করতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এবং অন্যান্য বিতরণকারী সংস্থাগুলোর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মধ্যে রয়েছে বিসিআইসি।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান বাবুল মিঞা জানান, ‘আমাদের কারখানাগুলোর শতভাগ উৎপাদন ক্ষমতা কাজে লাগাতে সরকারি সংস্থাগুলোর আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। যেসব কারিগরি বা কাঁচামাল সংক্রান্ত বাধা ছিল, সেগুলো একে একে দূর করা হচ্ছে।’
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিসিআইসি কেবল পুরোনো কারখানা খোলার মধ্যেই সীমিত থাকছে না, বরং আগামী ৩-৫ বছরের মধ্যে বাৎসরিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ লাখ মেট্রিক টনে রূপান্তর করতে চায়। এই বড় লক্ষ্য অর্জনে পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন ইউরিয়া ও টিএসপি প্ল্যান্ট নির্মাণ এবং ঐতিহ্যবাহী ‘চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড’ (সিইউএফএল)-এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজ বিবেচনাধীন রয়েছে।
তবে এই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রচুর বৈদেশিক ও সরকারি বিনিয়োগ, নিয়মিত জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উৎপাদন খরচে সাশ্রয়ী হওয়া জরুরি। দেশীয় তৈরি সারের উৎপাদন ব্যয় যেন আন্তর্জাতিক আমদানিকৃত সারের মূল্যের চেয়ে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সাশ্রয়ী হয়, সেই দিকটিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিসিআইসির এই কর্মপরিকল্পনা সফল হলে বাংলাদেশের সার্বিক কৃষি ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র ওঠানামা ও বৈশ্বিক সংকট থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পাবে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমার পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষক সঠিক সময়ে সুলভ মূল্যে সার হাতে পাবেন। সরকার ও বিসিআইসির এই যৌথ পদক্ষেপ তাই বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।






















