রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রস্তাবিত ‘এমআরটি লাইন-১’ এবং হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত ‘এমআরটি লাইন-৫’ (উত্তর) নির্মাণকাজে এক নতুন ও যুগান্তকারী অগ্রগতির সূচনা হয়েছে। এই দুই মেগা প্রকল্পের মোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের আওতায় উড়াল স্টেশন, দীর্ঘ উড়াল রেলপথ এবং দুটি পৃথক ডিপোর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকাজের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট চুক্তি সম্পাদন করেছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মেট্রোরেল ভবনের হলরুমে পৃথকভাবে এই বর্ণাঢ্য চুক্তিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। নতুন এই চুক্তি অনুযায়ী, দুটি নতুন মেট্রোরেল রুটে সর্বমোট আটটি আধুনিক উড়াল স্টেশন এবং প্রায় ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এর পাশাপাশি হেমায়েতপুর ও পূর্বাচলে অবস্থিত মূল ডিপোসমূহের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত ভিত্তি গড়ে তোলা হবে।
ডিএমটিসিএল কর্তৃক সরাসরি বাস্তবায়নাধীন এই বৃহৎ দুই প্রকল্পে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়ন রয়েছে। প্রকল্প দুটিতে সর্বমোট সম্ভাব্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা।
বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১-এর সর্বমোট দৈর্ঘ্য হবে ৩১ কিলোমিটার। পুরো এই যাত্রাপথে ভূগর্ভস্থ ও উড়াল মিলিয়ে মোট ২১টি স্টেশন স্থাপন করা হবে। অন্যদিকে, হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত এমআরটি লাইন-৫-এর সার্বিক দৈর্ঘ্য হবে ২০ কিলোমিটার এবং সেখানে স্টেশন থাকবে মোট ১৪টি। মেগা এই দুই মেট্রোরেল প্রকল্পের সার্বিক নির্মাণকাজ আগামী ২০৩৩ সালের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডিএমটিসিএলের জারিকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১-এর পূর্বাচলস্থ মূল ডিপোতে বিশেষ ওয়ার্কশপ, স্ট্যাবলিং শেড ও অপারেশন ম্যানেজমেন্ট সেন্টারসহ (ওএমসি) মোট ৪৯টি ছোট-বড় স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোগত কাজের জন্য চীনের খ্যাতিমান সিনোহাইড্রো ও এসইবিসিএলের যৌথ কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হয়েছে।
এ ছাড়া এমআরটি লাইন-১-এর অধীনে পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উড়ালপথ এবং জোয়ার সাহারা, বোয়ালিয়া ও মস্তুল নামের তিনটি উড়াল স্টেশন নির্মাণের জন্য যৌথভাবে চীনের সিআরইসি ও এমবিইসি এবং জাপানের এমআইএলের সঙ্গে পৃথক চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে।
অপরদিকে, এমআরটি লাইন-৫-এর হেমায়েতপুরের মূল ডিপোতে আধুনিক প্রশাসনিক ভবন, বিশাল স্ট্যাবলিং ইয়ার্ড, কেন্দ্রীয় গুদাম ও ওয়ার্কশপ শেডসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। সুনির্দিষ্ট এই কাজের ঠিকাদারি দায়িত্ব পেয়েছে তাইওয়ানের বিখ্যাত সিপিসি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় হানিল।
প্রকল্পের অন্য একটি পৃথক প্যাকেজের আওতায় হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার এবং নতুন বাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত মোট ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে হেমায়েতপুর, বালিয়াপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার এবং ভাটারা স্টেশনসমূহ সরাসরি নির্মাণের উদ্দেশ্যে যৌথভাবে সিআরইসি, এমআইএল ও এমবিইসির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছে কর্তৃপক্ষ।
মর্যাদাপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সুযোগ্য সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সম্মানিত সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহমদ। এ সময় ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলমসহ জাপান দূতাবাসের প্রতিনিধি, জাইকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কারিগরি কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি পরামর্শক এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, “রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট নিরসন করা এবং সাধারণ নগরবাসীর দৈনিক যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজ। সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ঢাকা নগরীতে এক আধুনিক, শতভাগ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব সার্বজনীন গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।”
ডিএমটিসিএল সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এই চারটি আন্তর্জাতিক প্যাকেজের অবকাঠামোগত কাজ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গোটা রাজধানীর সমন্বিত মেট্রোরেল ব্যবস্থার দ্রুততম সম্প্রসারণে এক নতুন মাইলফলক অর্জিত হবে।






















