বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমির ডা. শফিকুর রহমান মন্তব্য করেছেন, ‘আওয়ামী লীগ মূলত কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল নয়, এটি হলো ফ্যাসিবাদের একটি ক্লাব। এই সংগঠনটির নেতারা যখনই বিভিন্ন অনৈতিক কায়দায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তখনই দেশজুড়ে বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড ও চরম আতঙ্ক চালিয়ে নিজেদের শাসনের ভিত্তি পাকাপোক্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে।’
গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলের দিকে রাজধানী ঢাকার কাকরাইলে অবস্থিত ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মাল্টিপারপাস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কড়া কথা বলেন। ঐতিহাসিক ‘২৮ অক্টোবর পল্টন ট্রাজেডি দিবস’ স্মরণ ও পালন উপলক্ষে এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবাদ সভার আনুষ্ঠানিক আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের বিগত আমলের নানা কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সারা দেশে সমান তালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, ব্যাপক লুটপাট, চাঁদাবাজি এবং অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমহানি করেছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তৎকালীন শীর্ষ শাসকের নিজস্ব সন্তান ব্যাংক ডাকাতির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময়কালে প্রায় ১০ হাজার দেশপ্রেমিক সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। মূলত নিজেদের ধারাবাহিক অপকর্ম ও অন্যায়ের বোঝা এত বেশি ভারী হয়ে গিয়েছিল যে, তারা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল এ দেশের আমজনতা ভবিষ্যতে আর কখনো তাদের ভোট বা সমর্থন দেবে না। আর ঠিক সেই কারণেই তারা সর্বাত্মক বাকশাল ব্যবস্থা চালু করেছিল এবং শোষক রক্ষী বাহিনী গঠন করেছিল।’
তিনি হুংকার দিয়ে আরও বলেন, ‘ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আওয়ামী লীগ কখনো স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারেনি। প্রতিবারই দেশের আপামর মানুষের কাছে চরম ধিকৃত ও লাঞ্ছিত হয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়েছে। সেই একই স্বৈরাচারী রাস্তা যদি বর্তমান বা ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী অবলম্বন করার দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের শেষ পরিণতিও কিন্তু পূর্বসূরিদের চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না। কোনো অবস্থাতেই এই স্বাধীন বাংলাদেশকে আর নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের হাতে চিরতরে ইজারা দিতে দেওয়া হবে না।’
বিগত আমলে নিজেদের শীর্ষ নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াত আমির আরও দাবি করেন, ‘জামায়াতের সর্বস্তরের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় জড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই অন্যায় ও জুলুমের চূড়ান্ত বিচারিক পরিণাম কিন্তু অপরাধীদের শেষ পর্যন্ত ভোগ করতেই হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় এসব প্রহসনের বিচারের একদম শেষ দেখে ছাড়বে জামায়াতে ইসলামী।’
ইতিহাসের স্মৃতি রোমন্থন করে ২০০৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, তৎকালীন চার–দলীয় জোট সরকারের নির্দিষ্ট মেয়াদের শেষ সপ্তাহে এসে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান তাঁর ক্যাডার ও নেতাকর্মীদের লগি–বৈঠা হাতে নিয়ে হিংস্র মনোভাব নিয়ে ঢাকায় রাজপথে নেমে আসার প্রকাশ্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘রাজধানীর শহরের পিচঢালা শুষ্ক রাস্তায় কখনো নৌকা চলাচল করে না। মূলত লগি–বৈঠার সেই রক্তক্ষয়ী মহড়া আনা হয়েছিল রাজপথে প্রকাশ্যে মানুষ পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি তাদের অনুগত দোসর বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোও সমানভাবে শরিক ও দায়ী ছিল।’
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের কোনো কোনো মহল থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পুনর্বাসনের সুক্ষ্ম চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সরাসরি অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমাদের স্পষ্ট বার্তা—কোনো অবস্থাতেই বিষধর সাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করবেন না। অন্যথায় সুযোগ বুঝে এ ক্ষতিকর সাপই আপনাদের ওপর ছোবল মেরে সবকিছু ধূলিসাৎ ও শেষ করে দেবে।’


























