Dhaka ০৫:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

বিরোধীদলে থাকতেই কবর দিতে বাধা, রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে গেলে কী করবেন: তাসনিম জারা

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৪৬:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫ বার দেখা হয়েছে

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ও বিশিষ্ট কলামিস্ট ডা. তাসনিম জারা বলেছেন, নিজেদের রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে সবসময় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদার জোরালো কথা বললেও জামায়াতে ইসলামী অন্য সাধারণ মানুষের বেলায় ঠিক এর বিপরীত আচরণ করতে নারাজ। বিরোধীদলে থাকাবস্থায়ই যদি তারা নিজ এলাকার সাধারণ মানুষের বসতভিটায় মৃত ব্যক্তির মরদেহ কবর দিতে এ ধরনের বাধা প্রদান করেন, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা পুরোপুরি তাদের হাতে চলে গেলে তারা কেমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন—সেই প্রশ্ন জোরালোভাবে তুলেছেন তিনি।

আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে প্রকাশিত এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে ডা. তাসনিম জারা এই কঠোর সমালোচনা ও প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেন।

সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “আমাদের চিরচেনা সমাজব্যবস্থায় কেউ মারা গেলে তার সৎকার বা কবর খুঁড়তে কখনো বাইরে থেকে লোক ডেকে আনতে হয় না। মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পাড়ার তরুণ ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই ছুটে আসে। কেউ বাঁশ কেটে নিয়ে আসে, আবার কেউ নিয়ে আসে চাটাই। মৃত মানুষের দাফনকাজে কখনো বিলম্ব করতে নেই—এই শিক্ষা নিয়েই আমরা বড় হয়েছি।”

গত শনিবারের একটি বেদনাদায়ক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তাসনিম জারা লেখেন, “গত শনিবার সকালের দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, না ফেরার দেশে চলে যান। কিন্তু সারাদিন ধরে তাঁর শোকাহত পরিবারকে মরদেহ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা সেই সময় প্রকাশ্য মিছিল করেছেন, এমনকি মাইকে ও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে প্রচার করেছেন যে, পিরোজপুরের এক ফোঁটা মাটিতেও তাঁকে কোনোভাবেই দাফন করতে দেওয়া হবে না।”

পারিবারিক কবরস্থানের করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও লেখেন, “ওই বৃদ্ধ মানুষের বাড়ির উঠানে প্রথমে একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন যে, কিছু মানুষ এসে সেই খোঁড়া কবরজমি জোরপূর্বক ভরাট করে দেয়। পরবর্তীতে ফুফুদের সাথে নিয়ে তিনি নিজেই নতুন করে কবর খুঁড়তে বাধ্য হন। এলাকায় চরম আতঙ্ক ও পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সেই কঠিন সময়ে কবর খুঁড়তে পরিবারের পাশে পাড়ার আর কাউকেই পাওয়া যায়নি। পাড়ার তরুণ ছেলেদের হাতে যে কোদাল থাকার কথা, সেদিন সেই কোদাল বাধ্য হয়ে মৃত ব্যক্তির অবলা মেয়ে ও বোনদের নিজ হাতে ধরতে হয়েছিল। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মাঝরাতের অনেক পরে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর পাহারায়, ওই মেয়ে ও বোনদের নিজেদের হাতে খোঁড়া সেই makeshift কবরেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের নিজস্ব গণ্ডির বাইরে সেখানে আর কোনো সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন না।”

মৃত ব্যক্তির মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে জামায়াতের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে এনসিপির এই সাবেক নেত্রী লেখেন, “প্রয়াত ওই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত স্বীকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথচ পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মানিক পশারী একজন ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা; তাই তাঁকে কোনো রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার তো দেওয়া হবেই না, এমনকি পিরোজপুরের পবিত্র মাটিতেও তাঁকে দাফন করতে দেওয়া হবে না। অথচ দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেই একই দায়িত্বশীল নেতা আবার দাবি করেন যে, জামায়াতের নেতারা কখনো লাশের রাজনীতি করেন না!”

তিনি আরও লেখেন, “মানিক পশারী আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই যৌক্তিক প্রশ্ন যে কেউ তুলতে পারেন। সেই প্রশ্ন উত্থাপন করার সঠিক জায়গাও রয়েছে। তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্য স্বাধীন ও প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আদালত রয়েছে। কিন্তু জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিজেরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন যে, সেই আইনি ও ঐতিহাসিক প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন মৃত মানুষের দাফন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে শক্তির মহড়া দেখিয়ে। আমাদের বাঙালি সমাজে চিরকাল প্রথা রয়েছে যে, জানাজার নামার আগে মৃত ব্যক্তির সন্তান বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলেন, ‘আমার আব্বা বা ভাই যদি জীবদ্দশায় আপনাদের মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকেন, দয়া করে সবাই মাফ করে দেবেন।’ আমরা সবাই তাঁকে ক্ষমা করে দিই। কারণ মানুষ মারা যাওয়ার পর তার দুনিয়াবি সব হিসাব-নিকাশ চিরতরে চুকে যায়। যা সামান্য বাকি থাকে, তার বিচার সম্পূর্ণ মহান আল্লাহর হাতে। কিন্তু গত শনিবার পিরোজপুরের জামায়াতের নেতাকর্মীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অমানবিক এক পথ বেছে নিলেন। নিজের গ্রামের মাটিতে মানিক পশারীর একটা সাধারণ জানাজাটুকুও পড়ার সুযোগ দেওয়া হলো না। গ্রামের সাধারণ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও তাঁর শোকার্ত পরিবার পেল না।”

জামায়াতের মানসিকতার কড়া সমালোচনা করে ডা. তাসনিম জারা লেখেন, “পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না—ওনারা এই কথাটি এমন এক দাম্ভিক ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেন, যেন এই গোটা মাটির দলিল একচেটিয়াভাবে ওনাদের নামে রেজিস্ট্রি করা আছে। যেন একজন মানুষ মৃত্যুর পর তাঁর নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শান্তিতে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই মৌলিক অনুমতির অধিকারও তাদের কাছ থেকেই ছলে-বলে নিতে হবে। একসময় রাজনৈতিক অঙ্গনে ওনাদের বিরুদ্ধেই ঠিক একই ভাষায় স্লোগান দেওয়া হতো যে, ‘জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এই ধরনের বয়ান ও কথা যে কতখানি অন্যায় ও বৈষম্যমূলক, তা ওনাদের নিজেদেরই সবচেয়ে ভালো জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা সামান্য একটু হাতের নাগালে আসার সাথে সাথে, বিরোধীদলে থাকাবস্থাতেই তারা সেই অতীত শিক্ষা সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোর বিরোধিতা করেছিল। আর আজ সেই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই নির্ধারণ করে দিতে চাইছেন কে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার যোগ্য আর কার শেষ কবরটি কোথায় হবে।”

সর্বশেষ মন্তব্যে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় লেখেন, “নিজেদের দলীয় নেতাদের আইনি ও রাজনৈতিক অধিকারের বেলায় জামায়াত সবসময় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং মানবিক মর্যাদার সুউচ্চ কথা বলে। কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে সাধারণ অন্য মানুষের ক্ষেত্রে, তখন তারা সেই ন্যায়বিচারটুকু করতে চরম নারাজ। ভোটের ময়দানে নামার আগে এবং সাধারণ মানুষের সামনে বক্তৃতায় তারা খুব সুন্দর সুন্দর ইনসাফের কথা শোনান। অথচ বাস্তবে একজন মৃত মানুষের সাথে এবং তাঁর গভীর শোকাহত পরিবারের সাথে তারা এমন অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করেন। বিরোধীদলে থাকাবস্থাতেই যারা নিজের বসতভিটায় একটি মরদেহ কবর দিতে বাধা দেয়, কালক্রমে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা যদি সত্যি তাদের হাতে চলে যায়, তবে তারা সাধারণ মানুষের ওপর কী ধরনের তাণ্ডব চালাবেন—সেই প্রশ্ন আজ দেশবাসীর সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।”

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

বিরোধীদলে থাকতেই কবর দিতে বাধা, রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে গেলে কী করবেন: তাসনিম জারা

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৪৬:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ও বিশিষ্ট কলামিস্ট ডা. তাসনিম জারা বলেছেন, নিজেদের রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে সবসময় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদার জোরালো কথা বললেও জামায়াতে ইসলামী অন্য সাধারণ মানুষের বেলায় ঠিক এর বিপরীত আচরণ করতে নারাজ। বিরোধীদলে থাকাবস্থায়ই যদি তারা নিজ এলাকার সাধারণ মানুষের বসতভিটায় মৃত ব্যক্তির মরদেহ কবর দিতে এ ধরনের বাধা প্রদান করেন, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা পুরোপুরি তাদের হাতে চলে গেলে তারা কেমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন—সেই প্রশ্ন জোরালোভাবে তুলেছেন তিনি।

আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে প্রকাশিত এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে ডা. তাসনিম জারা এই কঠোর সমালোচনা ও প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেন।

সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “আমাদের চিরচেনা সমাজব্যবস্থায় কেউ মারা গেলে তার সৎকার বা কবর খুঁড়তে কখনো বাইরে থেকে লোক ডেকে আনতে হয় না। মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পাড়ার তরুণ ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই ছুটে আসে। কেউ বাঁশ কেটে নিয়ে আসে, আবার কেউ নিয়ে আসে চাটাই। মৃত মানুষের দাফনকাজে কখনো বিলম্ব করতে নেই—এই শিক্ষা নিয়েই আমরা বড় হয়েছি।”

গত শনিবারের একটি বেদনাদায়ক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তাসনিম জারা লেখেন, “গত শনিবার সকালের দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, না ফেরার দেশে চলে যান। কিন্তু সারাদিন ধরে তাঁর শোকাহত পরিবারকে মরদেহ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা সেই সময় প্রকাশ্য মিছিল করেছেন, এমনকি মাইকে ও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে প্রচার করেছেন যে, পিরোজপুরের এক ফোঁটা মাটিতেও তাঁকে কোনোভাবেই দাফন করতে দেওয়া হবে না।”

পারিবারিক কবরস্থানের করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও লেখেন, “ওই বৃদ্ধ মানুষের বাড়ির উঠানে প্রথমে একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন যে, কিছু মানুষ এসে সেই খোঁড়া কবরজমি জোরপূর্বক ভরাট করে দেয়। পরবর্তীতে ফুফুদের সাথে নিয়ে তিনি নিজেই নতুন করে কবর খুঁড়তে বাধ্য হন। এলাকায় চরম আতঙ্ক ও পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সেই কঠিন সময়ে কবর খুঁড়তে পরিবারের পাশে পাড়ার আর কাউকেই পাওয়া যায়নি। পাড়ার তরুণ ছেলেদের হাতে যে কোদাল থাকার কথা, সেদিন সেই কোদাল বাধ্য হয়ে মৃত ব্যক্তির অবলা মেয়ে ও বোনদের নিজ হাতে ধরতে হয়েছিল। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মাঝরাতের অনেক পরে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর পাহারায়, ওই মেয়ে ও বোনদের নিজেদের হাতে খোঁড়া সেই makeshift কবরেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের নিজস্ব গণ্ডির বাইরে সেখানে আর কোনো সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন না।”

মৃত ব্যক্তির মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে জামায়াতের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে এনসিপির এই সাবেক নেত্রী লেখেন, “প্রয়াত ওই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত স্বীকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অথচ পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মানিক পশারী একজন ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা; তাই তাঁকে কোনো রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার তো দেওয়া হবেই না, এমনকি পিরোজপুরের পবিত্র মাটিতেও তাঁকে দাফন করতে দেওয়া হবে না। অথচ দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেই একই দায়িত্বশীল নেতা আবার দাবি করেন যে, জামায়াতের নেতারা কখনো লাশের রাজনীতি করেন না!”

তিনি আরও লেখেন, “মানিক পশারী আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই যৌক্তিক প্রশ্ন যে কেউ তুলতে পারেন। সেই প্রশ্ন উত্থাপন করার সঠিক জায়গাও রয়েছে। তথ্য যাচাই-বাছাই করার জন্য স্বাধীন ও প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আদালত রয়েছে। কিন্তু জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিজেরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন যে, সেই আইনি ও ঐতিহাসিক প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন মৃত মানুষের দাফন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে শক্তির মহড়া দেখিয়ে। আমাদের বাঙালি সমাজে চিরকাল প্রথা রয়েছে যে, জানাজার নামার আগে মৃত ব্যক্তির সন্তান বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলেন, ‘আমার আব্বা বা ভাই যদি জীবদ্দশায় আপনাদের মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকেন, দয়া করে সবাই মাফ করে দেবেন।’ আমরা সবাই তাঁকে ক্ষমা করে দিই। কারণ মানুষ মারা যাওয়ার পর তার দুনিয়াবি সব হিসাব-নিকাশ চিরতরে চুকে যায়। যা সামান্য বাকি থাকে, তার বিচার সম্পূর্ণ মহান আল্লাহর হাতে। কিন্তু গত শনিবার পিরোজপুরের জামায়াতের নেতাকর্মীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অমানবিক এক পথ বেছে নিলেন। নিজের গ্রামের মাটিতে মানিক পশারীর একটা সাধারণ জানাজাটুকুও পড়ার সুযোগ দেওয়া হলো না। গ্রামের সাধারণ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও তাঁর শোকার্ত পরিবার পেল না।”

জামায়াতের মানসিকতার কড়া সমালোচনা করে ডা. তাসনিম জারা লেখেন, “পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না—ওনারা এই কথাটি এমন এক দাম্ভিক ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেন, যেন এই গোটা মাটির দলিল একচেটিয়াভাবে ওনাদের নামে রেজিস্ট্রি করা আছে। যেন একজন মানুষ মৃত্যুর পর তাঁর নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শান্তিতে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই মৌলিক অনুমতির অধিকারও তাদের কাছ থেকেই ছলে-বলে নিতে হবে। একসময় রাজনৈতিক অঙ্গনে ওনাদের বিরুদ্ধেই ঠিক একই ভাষায় স্লোগান দেওয়া হতো যে, ‘জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এই ধরনের বয়ান ও কথা যে কতখানি অন্যায় ও বৈষম্যমূলক, তা ওনাদের নিজেদেরই সবচেয়ে ভালো জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা সামান্য একটু হাতের নাগালে আসার সাথে সাথে, বিরোধীদলে থাকাবস্থাতেই তারা সেই অতীত শিক্ষা সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোর বিরোধিতা করেছিল। আর আজ সেই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই নির্ধারণ করে দিতে চাইছেন কে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার যোগ্য আর কার শেষ কবরটি কোথায় হবে।”

সর্বশেষ মন্তব্যে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় লেখেন, “নিজেদের দলীয় নেতাদের আইনি ও রাজনৈতিক অধিকারের বেলায় জামায়াত সবসময় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং মানবিক মর্যাদার সুউচ্চ কথা বলে। কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে সাধারণ অন্য মানুষের ক্ষেত্রে, তখন তারা সেই ন্যায়বিচারটুকু করতে চরম নারাজ। ভোটের ময়দানে নামার আগে এবং সাধারণ মানুষের সামনে বক্তৃতায় তারা খুব সুন্দর সুন্দর ইনসাফের কথা শোনান। অথচ বাস্তবে একজন মৃত মানুষের সাথে এবং তাঁর গভীর শোকাহত পরিবারের সাথে তারা এমন অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করেন। বিরোধীদলে থাকাবস্থাতেই যারা নিজের বসতভিটায় একটি মরদেহ কবর দিতে বাধা দেয়, কালক্রমে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা যদি সত্যি তাদের হাতে চলে যায়, তবে তারা সাধারণ মানুষের ওপর কী ধরনের তাণ্ডব চালাবেন—সেই প্রশ্ন আজ দেশবাসীর সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।”