বড় ছেলের রয়েছে ঢাকার উত্তরায় সুদৃশ্য ছয়তলা ভবন ও নিজস্ব বৈদ্যুতিক বোর্ড তৈরির কারখানা, ছোট ছেলেও ঢাকায় ভালো অবস্থানে কর্মরত এবং দুই মেয়েকেও পারিবারিকভাবে ভালো পাত্রস্থ করা হয়েছে। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জীবনের অমূল্য ১০টি বছর সুদূর সৌদি আরবে কঠোর পরিশ্রম করে কাটিয়েছিলেন ৬৫ বছর বয়সি মা তাহমিনা বেগম। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সার্থক মায়ের ভাগ্যে জুটেছিল কেবল চরম একাকীত্ব। শেষ পর্যন্ত সেই একাকী ভাড়াবাসা থেকেই তার পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার নতুন হাট এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে পুলিশ ওই বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, মৃত্যুর অন্তত এক থেকে দুই দিন আগেই তাহমিনা বেগমের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।
নিহত তাহমিনা বেগম বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের রাকুদিয়া গ্রামের মৃত কদম আলী হাওলাদারের সহধর্মিণী ছিলেন। আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে তিনি তাঁর স্বামীকে হারান। স্বামীর মৃত্যুর পরপরই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখে চারকিশোর সন্তানকে নিয়ে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন শুরু হয়েছিল।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও নিকটাত্মীয়দের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সন্তানদের ভবিষ্যতের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়তে একপর্যায়ে নিজের ভিটেমাটির বসতঘর পর্যন্ত বিক্রি করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তাহমিনা। সেখানে দীর্ঘ প্রায় এক দশক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন তিনি। প্রবাস থেকে অর্জিত সেই কষ্টের অর্থ দিয়েই সন্তানদের লালন-পালন করে বড় ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে তোলেন।
তাঁর বড় ছেলে সুমন বর্তমানে রাজধানী ঢাকার উত্তরায় বসবাস করেন। সেখানে তাঁর নিজস্ব ছয়তলা বাড়ি ও একটি লাভজনক বৈদ্যুতিক বোর্ড তৈরির কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর ছোট ছেলে আওলাদও ঢাকায় চাকরি করেন এবং দুই মেয়ে হিরা ও মুক্তাকে ভালো পরিবারে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত তিন মাস আগে তাহমিনা বেগমের বড় ভাই রমিজ উদ্দিনের মাধ্যমে নতুন হাট এলাকার ওই বাসাটিতে ওঠেন। এরপর থেকে তিনি সেখানে সম্পূর্ণ একাই বসবাস করতেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি মাঝেমধ্যে এলাকার বিভিন্ন বাজারে সামান্য ঘোরাফেরা করতেন।
বাড়ির মালিক আব্দুর বারেক সংবাদকর্মীদের জানান, “তাহমিনা বেগম প্রায়ই নানা রোগে ভুগে অসুস্থ থাকতেন। গত দুই দিন ধরে তাকে ঘরের বাইরে দেখা যায়নি। পরে শনিবার বিকেল থেকে বাসার আশপাশে একটা পচা দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম আশপাশের কোথাও হয়তো মরা ইঁদুর পচেছে। কিন্তু রোববার সকালে বুঝতে পারি যে দুর্গন্ধটি সরাসরি তাহমিনার ঘর থেকেই আসছে।”
তিনি আরও জানান, গত তিন মাসে তাহমিনার কোনো ছেলে বা মেয়েকে একবারও ওই বাসায় এসে তাঁকে দেখতে আসতে দেখা যায়নি। পরে ঘটনাটি সন্দেহজনক মনে হলে তাহমিনার বড় ভাইকে খবর দেওয়া হয়। তিনি এসে ঘরের দরজা সামান্য খোলা দেখতে পান এবং ভেতরে বোনের নিথর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে দ্রুত পুলিশকে খবর দেন। পরবর্তীতে পুলিশ এসে মরদেহটি উদ্ধার করে।
প্রতিবেশী শাহানা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, “তাহমিনা বেগম এর মধ্যে একাধিকবার স্ট্রোক করেছিলেন বলে আমরা শুনেছি। তাঁর পা প্রায়ই ফুলে থাকত। এ ছাড়া তাঁর শরীরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল শারীরিক সমস্যাও ছিল। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করতেন না তিনি।”
বাবুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান এ বিষয়ে জানান, “খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মারা যাওয়ার এক থেকে দুই দিন পর বিষয়টি জানাজানি হয়েছে। ময়নাতদন্তের সম্পূর্ণ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই কেবল মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে যদি সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর তীব্র দাবি, পুলিশ যখন তাহমিনার মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন তাঁর কিছু স্বজন ও ছেলে-মেয়েরা পুলিশকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য সংগ্রহেও বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে নিহতের পরিবারের কোনো সদস্যের তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং তাহমিনার ছেলে-মেয়েরাও গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলতে রাজি হননি।
























