দেশে দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার ব্যবসায়িক লাইসেন্স সেবা পুরোপুরি অনলাইনে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সাথে এসব লাইসেন্সের বর্তমান মেয়াদ ১ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর তোপখানা রোডস্থ ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) এবং ইআরএফ-এর যৌথ উদ্যাগে আয়োজিত ‘Bangladesh’s LDC Graduation Trajectory: Critical Challenges and Exploring Policy Options’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব তথ্য প্রকাশ করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে নতুন ও বৃহৎ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ও হয়রানিমুক্ত ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং ব্যবসায়িক বিরোধের দ্রুত ও স্বচ্ছ আইনি নিরসন অত্যন্ত জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে উৎপাদিত পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রির জন্য সাধারণ মানুষের সার্বিক ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।
বাণিজ্য সহজীকরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে গেলে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে উদ্যোক্তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। স্রেফ ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ, ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং প্রাথমিক ছাড়পত্র পাওয়ার পর আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) হাতে পেয়ে শেষ পর্যন্ত নতুন যন্ত্রপাতির ঋণপত্র (এলসি) খোলা পর্যন্ত গড়ে প্রায় ৩৫৫ দিন সময় পার হয়ে যায়। ব্যবসায়ের প্রাথমিক পর্যায়েই এত দীর্ঘ সময় অপচয় হলে নতুন উদ্যোক্তাদের কাজের উৎসাহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই নাজুক পরিস্থিতি ও দীর্ঘসূত্রতা আমূল বদলে দিতে সরকার একটি সমন্বিত একক অনলাইন পোর্টাল (Single Online Portal)-এর মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের সর্বাধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি। মন্ত্রী স্পষ্ট করেন, নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় একজন উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় নথিপত্র অনলাইনে জমা ও নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে দেশ বা বিদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবেন। একই সাথে জমা হওয়া সেই ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তহবিলে সরাসরি পৌঁছে যাবে।
তিনি আরও জানান, যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) যাবতীয় নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবা সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল ও অনলাইনে আনা হচ্ছে। সেই সাথে বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায়িক লাইসেন্সের বর্তমান মেয়াদ বাড়িয়ে তিন থেকে পাঁচ বছর করার পূর্ণাঙ্গ উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আলাদা আলাদা পরিদর্শনের পরিবর্তে একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় পরিদর্শন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কার্যকর সংস্কারের সুবাদে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে অনুমোদন ও লাইসেন্সের জন্য উদ্যোক্তাদের দিনের পর দিন অপেক্ষার এই প্রথা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
জাতীয় শিল্পে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে নতুন বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় উল্লেখ করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশে গ্যাসের সার্বিক সরবরাহ বৃদ্ধি করতে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং একাধিক নতুন গ্যাসকূপ খননের কাজ দ্রুগ গতিতে এগোচ্ছে। পাশাপাশি দেশে অনবায়নযোগ্য শক্তির ওপর চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
তিনি আরও পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেন যে, আমদানি করা এলএনজি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় মোটাদাগের পণ্যের পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত না থাকায় বৈশ্বিক বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশ তীব্র অর্থনৈতিক চাপে পড়ে। এ ধরণের সংকট এড়াতে দেশে উন্নত ও বড় পরিসরের কৌশলগত মজুত এবং আধুনিক সংরক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
দেশি-বিদেশি সর্বস্তরের বিনিয়োগকারীদের আস্থা সুদৃঢ় করা, ব্যবসা পরিচালনা সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করা এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত জাতীয় লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে আশ্বস্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সম্মানিত সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে এবং সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএসএম মঈনুল হকের সুনিপুণ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ ও উপস্থাপনা করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মোস্তফা আবিদ খান।


























