বতসোয়ানা সরকার আবারও হাতি শিকারের অনুমতি বাড়ানোর পর দেশজুড়ে সংরক্ষণকর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বের বৃহত্তম বন্য হাতির জনসংখ্যা থাকা এই দেশে সরকার বলছে সংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য শিকার প্রয়োজন, কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন—এই সিদ্ধান্ত মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলবে।
বিস্তীর্ণ শুষ্ক ভূমির দেশ বতসোয়ানায় বাস করে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হাতি—আফ্রিকার মোট হাতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। পুরো মহাদেশে যেখানে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার হাতি রয়েছে, সেই তুলনায় বতসোয়ানার সংখ্যা বিস্ময় জাগায়। অথচ এই প্রাচুর্যের আড়ালে বাড়ছে মানবজীবনের ভাঙচুর, ভীতি ও ক্ষোভ।
২০১৯ সালে পাঁচ বছরের শিকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে সরকার জানায়—হাতির সংখ্যা এত বেশি যে কৃষকের জমি, গ্রাম আর জলাধারগুলোতে নেমে আসছে হুমকি। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ২০২৬ সালের জন্য ট্রফি হান্টিংয়ের কোটা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৩০, যেখানে ২০২৫ সালে ছিল ৪১০।
ট্রফি হান্টিং মানে বৈধভাবে বন্য প্রাণী হত্যা, আর তাদের দাঁত, শিং বা দেহের কোনো বিশেষ অংশ সংগ্রহ করা। বিদেশি শিকারিদের জন্য বতসোয়ানার বিস্তীর্ণ বন, নদী আর নির্জন প্রান্তর বহুদিন ধরেই আকর্ষণীয়। সরকার বলে, এ থেকে যে বিপুল অর্থ আসে তা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সহায়তা করে। কেবল ২০২৪ সালেই শিকার লাইসেন্স থেকে এসেছে ৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
কিন্তু সংরক্ষণবাদীরা বলছেন—সংখ্যা বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে হাতির সমাজব্যবস্থা ও জনসংখ্যার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। বতসোয়ানার ইলিফ্যান্ট প্রোটেকশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ওআইৎসে নাওয়া আল জাজিরাকে বলেন—শিকার করা হাতির সংখ্যা অতিরিক্ত, সরকারকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ অ্যামি ডিকম্যান মনে করেন—ট্রফি হান্টিং বিতর্কিত হলেও এটি এখনো হাতি বিলুপ্তির প্রধান হুমকি নয়। তাঁর মতে, শিকারের আয় স্থানীয় জনগণকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করে। তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক—শিকারিরা সাধারণত বড় দাঁতের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হাতিকেই নিশানা করে, যাদের মধ্যে রয়েছে দলের নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার আর নতুন প্রজন্মকে জীবন শেখানোর ক্ষমতা। এই মূল্যবান সামাজিক সংযোগ ছিন্ন হলে বাকি হাতিগুলো আরও অস্থির হয়ে ওঠে, মানুষের সঙ্গে সংঘাতও বাড়তে পারে।
নাওয়া বলেন—গ্রামবাসী যখন মাঠে যান বা পশু খুঁজতে বের হন, তখন তারা প্রায়ই প্রজনন ঝাঁকের হাতির মুখোমুখি হন। শিকারের চাপের কারণে এসব হাতি আরও চঞ্চল, ভীত, আর সামান্য উত্তেজনাতেই তারা ফসল মাড়িয়ে পালিয়ে যায়—ভয় ও ক্ষতির চিহ্ন রেখে।
সমালোচকদের মতে, বতসোয়ানা চাইলে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগোতে পারে। তারা বলছেন—মানুষ ও হাতি পাশাপাশি বাঁচতে পারে, যদি গ্রামবাসীদের শেখানো হয় কীভাবে নিরাপদে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান করা যায়। নাওয়া জানান—পানি সরবরাহের জন্য নতুন বোরহোল খনন করলে পর্যটন বাড়তে পারে, স্থানীয়রাও হাতি দেখানোর মাধ্যমে আয় করতে পারবেন। দেশের কিছু এলাকায় এই পদ্ধতি সফল হয়েছে—বোরহোলের পানিতে আকৃষ্ট হাতিদের খুব কাছ থেকে দেখতে ছুটে আসে পর্যটকরা।
তিনি বলেন—হাতিরা কেবল শক্তির প্রতীক নয়, তারা প্রকৃতির ছন্দ বহন করে নিয়ে চলে। মানুষকে বুঝতে হবে, তাদের বাঁচানো মানে এই ভূমির ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। হত্যা নয়, সহাবস্থানের পথই দিতে পারে শান্তি—মানুষের জন্য, হাতির জন্য, বনভূমির জন্য।
















