অন্য দেশের তৈরি রূপরেখা নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং অন্যান্য বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীরা সহায়তা জোগাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত সাড়ে ছয় শতাংশ (৬.৫%) প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে সরকার পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। একই সাথে আগামী ২০৩০ সালের মাঝে কর-জিডিপির অনুপাতকে ১০ শতাংশের ঘরে উন্নীত করা এবং ধুঁকতে থাকা ব্যাংক খাতে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফেরানোই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আয়োজিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আমাদের ইতিহাসে এই প্রথমবার দেশীয় অগ্রাধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাইকা, চীনের এক্সিম ব্যাংক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্সিগুলো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের চিহ্নিত সংস্কার তালিকার ওপর ভিত্তি করেই বিদেশি সংস্থাগুলো তাঁদের সমর্থন দিচ্ছে, যা কেবল নির্দিষ্ট কোনো একটি সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।’
আইএমএফের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক কম পূর্বাভাসের বিষয়ে উপদেষ্টা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এখানে একধরনের ভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। আইএমএফ মূলত সতর্কতামূলক অবস্থান থেকে নিজস্ব গাণিতিক মডেলে হিসাব করে; তারা ধরে নেয় যদি দেশে কোনো সংস্কার না হয়, তবে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি কেমন দাঁড়াবে। প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে একেক প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন একেক রকম হওয়া স্বাভাবিক। সাধারণত বিশ্বব্যাংক বা এডিবির প্রক্ষেপণগুলো আইএমএফের চেয়ে খানিকটা উচ্চমুখী থাকে।’
আইএমএফের ‘আর্টিকেল ফোর’ মিশনের পর্যালোচনার কথা টেনে তিনি যোগ করেন, ‘অতীতের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে স্পষ্ট হবে যে আইএমএফ সবসময়ই বেশ রক্ষণশীল হিসাব পেশ করে থাকে। তাই তারা ৪.৭ শতাংশ বললেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন হতে পারে।’
বাজেট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করে তিনি জানান, ‘নির্বাচনী ইশতেহার ও পরবর্তীতে প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদী অর্থনৈতিক কৌশলে আমরা যেসব রূপরেখা স্পষ্ট করেছি, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী।’
মূল্যস্ফীতির নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, ‘সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার একটি বড় প্রভাব রয়েছে। এর বাইরে বিগত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতিও আমাদের বহন করতে হচ্ছে।’
সামাজিক সুরক্ষার গলদ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘বিগত সরকারের আমলে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিগুলো সুসংগঠিত ছিল না। প্রকৃত ভুক্তভোগীরা তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল, আর অনভিপ্রেত ব্যক্তিরা সুবিধা পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনও বলছে, বিগত তিন বছর ধরে সামাজিক সুরক্ষা ঠিকভাবে না দেওয়ার কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
নতুন সামাজিক কল্যাণমূলক পদক্ষেপের ব্যাপারে তিনি উল্লেখ করেন, ‘কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড কিংবা ফ্যামিলি কার্ডের মতো ব্যবস্থাগুলোকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যথোপযুক্ত উদ্যোগ হিসেবে প্রশংসা করেছে। আমরা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রযোগমুক্ত বৈজ্ঞানিক উপায় এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সহায়তায় এই সেবাগুলোকে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
শিক্ষা, সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে জাতীয় বাজেটের অংশ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘জিডিপির ৫ শতাংশ সামাজিক খাতে এবং নির্দিষ্ট অংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করার যে পরিকল্পনা আমরা করেছি, তা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছে। ফলে আমাদের অগ্রাধিকারভিত্তিক যেকোনো কর্মসূচিতে তারা অর্থায়ন করতে ইচ্ছুক।’
বৈশ্বিক ঋণ সহায়তা ও কর্মসূচির আকার নিয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ড. তিতুমীর বলেন, ‘ঋণের কিছু সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন বা প্রটোকল থাকে, যা আমরা অনুসরণ করছি। যেহেতু সরকার প্রতিটি সংস্কার বাস্তবায়নে গতি এনেছে, তাই এই সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলোও দ্রুততার সাথে কার্যকর রূপ নেবে।’
ঋণের সার্বিক পরিমাণ নিয়ে দর-কষাকষি চলছে কিনা—এমন প্রশ্নে তিনি এক বাক্যে স্বীকার করেন, ‘আন্তর্জাতিক মঞ্চে যেকোনো বড় অর্থায়নের আলোচনার পুরোটাই দর-কষাকষির ওপর নির্ভর করে। তবে আমাদের মৌলিক শর্ত হলো, দেশের অগ্রাধিকার আগে টিকিয়ে রাখা।’
সরকারের আগামীর অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি—২০৩০ সালের ভেতরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে রূপান্তর করা এবং ব্যাংকিং খাতের অরাজকতা বন্ধ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।’
আমানতকারীদের সুরক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকগুলোর সার্বিক অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।’
ব্যাংক খাতের অতীতের অনিয়ম ও বড় অংকের মূলধন পাচারের বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি মন্তব্য করেন, ‘বিগত সরকারের লাগামহীন দুর্নীতির খেসারত হিসেবে আজ দেশের নিরীহ জনগণকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের আমানতের খেয়ানত দিতে হচ্ছে। তাই সমন্বিত আইনি ও প্রশাসনিক প্রযোগে খেলাপী ঋণের জট ছাড়াতে হবে।’
ব্যাংক লুটপাটকারীদের শাস্তির আওতায় আনার তাগিদ দিয়ে ড. তিতুমীর স্মরণ করিয়ে দেন, ‘যেসব ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করেছে এবং যারা এদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্য করেছে—তারা দেশে থাকুক বা বিদেশে, তাদের প্রত্যেককে কঠোর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এটি জনগণের রক্তে অর্জিত অর্থ এবং এই মাত্রার আর্থিক অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়।’
ভবিষ্যতে এমন অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব কিনা—সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে তিনি মন্তব্য করেন, ‘লুটপাটকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা গেলে, ভবিষ্যতে অন্য কেউ দেশীয় অর্থ চুরির দুঃসাহস দেখানোর আগে শতবার চিন্তা করবে।’






















