বাংলাদেশে প্রবাসীদের পাঠানো বৈ বৈদেশিক মুদ্রার এক বিশাল অংশ আসছে বিশ্বের সুনির্দিষ্ট পাঁচটি দেশ থেকে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ৮৫৯ কোটি মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে কেবল সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়া—এই শীর্ষ পাঁচ দেশ থেকেই এসেছে ৫০৯ কোটি ডলার, যা দেশে আসা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ দাপ্তরিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ৭৫৮ কোটি ডলার। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে; যেখানে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ১০১ কোটি ডলার বা ১৩.২৮ শতাংশ।
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসার এই শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ধারা চলতি অক্টোবর মাসেও সমানভাবে অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনেই প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে ১১৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৯৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রেমিট্যান্স আসার প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ১৬৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসীরা। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, সেখান থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১২২ কোটি ডলার। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৭ কোটি ৭৬ লাখ ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ৭৭ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। আর তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৬৭ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের মধ্যে হুন্ডির মতো অবৈধ মাধ্যম পরিত্যাগ করে বৈধ্য ব্যাংকিং চ্যানেলে সরাসরি অর্থ পাঠানোর প্রবণতা জোরদার হওয়া এবং হুন্ডি চক্রের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কারণেই প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এর আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে মোট ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন, যা তার আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭.৩৪ শতাংশ বেশি ছিল। এমনকি তার আগের অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৬.৮৩ শতাংশ।
রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক সাফল্য সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের স্বস্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বেশ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের খোলা ও আন্তঃব্যাংক বাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকার আশপাশে স্থির রয়েছে।
অন্যদিকে, বাণিজ্যিক চাহিদা বাড়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশের সার্বিক আমদানি ব্যয় ১২.২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়সীমার মধ্যে জাতীয় রফতানি আয়ও বেড়েছে ৮.৩৮ শতাংশ। ফলে আমদানি ব্যয় কিছুটা বাড়লেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ বজায় থাকায় দেশের বৈ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং গ্রস রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত দেশের মোট গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিপিএম৬ (BPM6) পদ্ধতিতে এই রিজার্ভের পরিমাণ ৩১.৪০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে গত জুন মাসে গ্রস রিজার্ভ ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ৩২.৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকালে দেশের গ্রস রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য হারে কমে ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল, যা বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ছিল মাত্র ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য তারও আগে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের অনন্য রেকর্ড মাইলফলক অতিক্রম করেছিল।


























