খুলনা জেলার উপকূলীয় দাকোপ উপজেলায় ঢাকি নদীর তীব্র জোয়ারের চাপে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর প্রায় ৪০ মিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে সরাসরি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে আকস্মিক লোকালয়ে লোনাপানি প্রবেশ করে অন্তত ১২টি পরিবার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, উপজেলার আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বেড়িবাঁধে মারাত্মক ফাটল ও ভাঙন দেখা দেওয়ায় চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় হাজার হাজার মানুষ।
গত রোববার (১২ অক্টোবর ২০২৬) সকাল আটটার দিকে উপজেলার তিলডাঙা ইউনিয়নের বটবুনিয়া এলাকায় এই ভাঙনের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে নদীর ভাটা শুরু হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে ব্লক ও বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে পানি প্রবেশ বন্ধ করা সম্ভব হয়। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ভাঙনকবলিত ওই নির্দিষ্ট স্থানটি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরেই বটবুনিয়া এলাকার বেড়িবাঁধে ছোট-বড় ফাটল দেখা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত জোয়ারের প্রবল পানির চাপে বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এর ফলে নদীসংলগ্ন কয়েকটি ঘরবাড়ি এবং স্থানীয় বেশ কয়েকটি পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তিলডাঙা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দীন গাজী এ বিষয়ে জানান, মুহূর্তের মধ্যে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে কয়েকটি পরিবার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বালুভর্তি জিও ব্যাগ দিয়ে বাঁধ মেরামতের কাজ পরিচালনা করা হয়েছে।
এদিকে দাকোপের পানখালী ইউনিয়নের ৩১ নম্বর পোল্ডারের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ গ্রামীণ সড়ক ধসে ঢাকি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত ২ অক্টোবর বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। পানখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রাশেদুল ইসলাম বাবু ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বহুবার অবগত করা সত্ত্বেও দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এলাকার কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে পুরো জনপদ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু বটবুনিয়া বা পানখালিই নয়, পানখালী ইউনিয়নের জাবেরের খেয়াঘাট, খলিশা পূর্বপাড়ের লক্ষ্মীখোলা পিসের মাথা, তিলডাঙার কামিনীবাসিয়া ও গড়খালী-আন্দারমানিক, সুতারখালী ইউনিয়নের গুনারীর কালীবাড়ি লঞ্চঘাট, কালাবগী মডেল বাজার ও ফকিরপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া পোদ্দারগঞ্জ বাজার, বাণীশান্তা বাজার, ক্যাম্পঘাট, রেখামারি, কালাবগী বাজার, তেলিরকোনা বাজারের দক্ষিণ পাশ ও কাছারিবাড়িসহ অসংখ্য পয়েন্টে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
নদীবেষ্টিত দাকোপ উপজেলাটি ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রশাসনিক সুবিধার্থে এই এলাকাটিকে ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে ভাগ করেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, প্রতিবছরই বর্ষায় বা জোয়ারের সময় কোনো না কোনো এলাকায় বাঁধ ভেঙে প্লাবনের সৃষ্টি হয়, যার মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করা। জরুরি ভিত্তিতে লোকদেখানো বাঁধ মেরামত করা হলেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। দাকোপের কাকড়াবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষক সেলিম হোসেন অভিযোগ করেন যে, বাঁধ নির্মাণের সময় কাজের কাছাকাছি স্থান থেকে মাটি কাটা, নদীর তলদেশের বালু ব্যবহার এবং অত্যন্ত নিম্নমানের জিও ব্যাগ ফেলার কারণে কাজ মোটেও টেকসই হয় না, যা প্রতিবছর নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি করে।
পরিস্থিতির বিষয়ে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান জানান, তাঁরা ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন এবং খুব শিগগিরই এসব এলাকায় টেকসই সংস্কারকাজ শুরু করা হবে। অন্যদিকে, দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু জানিয়েছেন যে, ভাঙনের ফলে যাতে পুরো এলাকা প্লাবিত না হতে পারে, সেজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।


























