টেকনাফের সেন্টমার্টিন দ্বীপে ‘আল মোমিন সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত একটি বিনামূল্যে সুন্নতে খৎনা করানোর স্বাস্থ্য ক্যাম্পের পর বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। খৎনা করানোর মাত্র দুদিনের মাথায় অন্তত ৫০ জন শিশুর অস্ত্রোপচারকৃত স্থানে গুরুতর ইনফেকশন, পুঁজ জমা হওয়া, প্রচণ্ড ব্যথা এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের মতো শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকাল থেকে এই সমস্ত ভুক্তভোগী শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় দ্রুত সেন্টমার্টিন দ্বীপ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তাদের উদ্বিগ্ন স্বজনেরা। আকস্মিক এই ঘটনায় পুরো দ্বীপজুড়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সেন্টমার্টিন অবকাশ রিসোর্টে ‘আল মোমিন সমাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও সুন্নতে খৎনা দেওয়ার একটি বিশেষ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল। আয়োজক সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুসারে, একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ মেডিকেল টিম ওই কর্মসূচির আওতায় ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী মোট ২১০ জন শিশুকে সুন্নতে খৎনা করায়। খৎনা সম্পন্ন করার পর শিশুগুলোকে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধপত্রও প্রদান করা হয়েছিল বলে জানানো হয়। কিন্তু এর ঠিক দুদিন পর থেকেই শিশুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে শুরু করে।
সেন্টমার্টিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা নিয়ে প্রায় ৫০ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। এদের মধ্যে মো. ফয়সাল ও আইনুল ইসলাম নামের দুটি শিশুর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেফার করেন। দ্বীপের সাধারণ বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, খৎনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সংক্রান্ত সতর্কতা, স্টেরিলাইজেশন বা যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে শিশুদের ক্ষতস্থানে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। দ্বীপের বাসিন্দা কবির আহমেদ জানান, তিনি তাঁর ৯ বছরের ছেলেকে ওই ক্যাম্পে খৎনা করিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষতস্থানে তীব্র সমস্যা দেখা দেওয়ায় তিনি চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এবং দ্বীপ থেকে ট্রলার না পাওয়ার কারণে ছেলেকে সময়মতো টেকনাফে নিতেও পারছেন না।
এদিকে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, একটি মেডিকেল টিম এসে দুই শতাধিক শিশুর খৎনা করানোর পর দুদিন বাদে শিশুদের রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটেছে এবং তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. এনামুল হক নিশ্চিত করেছেন যে, সেন্টমার্টিনে এমন একটি ক্যাম্প পরিচালনার বিষয়ে তাদের স্বাস্থ্য বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ পূর্বে জানায়নি। খৎনা কর্মসূচিতে নেতৃত্বদানকারী প্রধান চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক আয়াছ উদ্দিন কাজল এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, দ্বীপের বেশিরভাগ পরিবারই অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, ফলে কোনো শিশুর বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে তাদের পক্ষে উন্নত চিকিৎসা করানো অত্যন্ত দুরূহ হবে। খৎনায় চিকিৎসাগত কোনো ভুল বা অবহেলা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তিনি। এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী জানান যে, খৎনার পর বেশ কিছু শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে নিবিড় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। মেডিকেল টিমের কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, গণমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রচারের পর নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এরই অংশ হিসেবে কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ডা. নওশাদ আলম কাননের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ মেডিকেল টিমকে দ্রুত সেন্টমার্টিনে পাঠানো হয়েছে।


























