মৎস্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি এই খাতের অর্থ ব্যবহারে যেকোনো ধরনের অপচয় রোধ, সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোরালো তাগিদ দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর মৎস্য ভবনে মৎস্য অধিদপ্তর আয়োজিত ‘মৎস্যখাতে বাজেট ও সরকারের উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক এক বিশেষ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেন।
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ এই চিরন্তন ঐতিহ্যের সঙ্গে মৎস্য খাত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংকোচন এবং পরিবেশগত বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে দেশি মাছের প্রাপ্যতা ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। তাই কেবল মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করাই নয়, বরং মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুরক্ষার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলা অভয়াশ্রমগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, কেবল প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয় করলেই চলবে না; অভয়াশ্রমগুলো বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ সৃষ্টিই অভয়াশ্রমের মূল লক্ষ্য হওয়ায় কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হলো এবং তার বিপরীতে বাস্তবে কী ধরনের ফল পাওয়া গেল, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করার ওপর তিনি জোর দেন।
এ ছাড়া মৎস্যজীবীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো অযোগ্য বা ভুয়া ব্যক্তির নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকলে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাই স্থানীয় পর্যায়ে তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক টুনা মাছ আহরণের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশও এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে। তবে শুধু জরিপ পরিচালনা ও অর্থ অপচয় না করে জরিপের ফলাফলকে কীভাবে বাস্তবসম্মত মৎস্য আহরণে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার। গভীর সমুদ্রের এই বিশাল মৎস্যসম্পদ সঠিকভাবে আহরণের জন্য বাংলাদেশকে দক্ষ জনবল, উপযুক্ত জলযান এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। দেশের সার্বিক উন্নয়নে সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাসহ সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে এবং মৎস্য খামারিদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত খামার পরিদর্শন ও কার্যক্রম তদারক করার মাধ্যমে দেশের মৎস্য খাতকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, মিঠাপানির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং দেশের সকল নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়কে মৎস্য উৎপাদনের সঠিক আওতায় নিয়ে আসার জন্য বর্তমান সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে জলাশয় ও নদ-নদী দূষণমুক্ত রাখা এবং নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি মাছের উৎপাদনের সাথে সাথে মৎস্যপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ সততা, নিষ্ঠা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার দিয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো: খালেদ কনকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত কর্মশালায় সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেন। এ ছাড়া আলোচক হিসেবে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য অধ্যাপক এ এস এম গোলাম হাফিজ। কর্মশালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।






















