ব্যাংক খাতের মালিকানা কাঠামোয় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং পরিচালনা পর্ষদে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় নতুন কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি তাদের নিজেদের নিট সম্পদের চেয়ে বেশি মূল্যের ব্যাংকের শেয়ার ক্রয় করতে পারবে না—তা একক ব্যাংকের ক্ষেত্রেই হোক কিংবা একাধিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যে যদি কোনো কোম্পানি নিজ নিট সম্পদের চেয়ে বেশি অর্থের ব্যাংকের শেয়ার কিনে থাকে, তবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে তা সমন্বয় করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
বিশ্লেষক ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের মতো একক কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী যেন বিভিন্ন বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকের পর্ষদ জিম্মি করতে না পারে, তা রোধ করতেই এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (২০২৩ সালে সংশোধিত) এর ১৪ক(১) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পরিবার একক বা যৌথভাবে একটি ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হতে পারেন না। তবে শেয়ার ক্রয়ের টাকার উৎসের ওপর আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকার সুযোগ নিয়ে এস আলম গ্রুপ ব্যাংক থেকেই নেওয়া ঋণের অর্থ দিয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ মোট নয়টি ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনে সেগুলোর পর্ষদ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। নিজস্ব নামের পাশাপাশি নিজেদের তৈরি করা বেনামী ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে এসব শেয়ার কেনা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে ‘আরমাডা স্পিনিং মিলস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে পর্ষদে এনে চেয়ারম্যান করা হয়। তৎকালীন সময়ে আরাস্তু খান ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উন্মোচিত হয় যে আরমাডা স্পিনিং মিলস মূলত এস আলম গ্রুপের গড়ে তোলা একটি ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠান।
বেনামে এভাবে ব্যাংকের শেয়ার কেনা ও পর্ষদ দখল বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগেও নতুন আইনি শর্ত আরোপ করেছে। নতুন বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো শেয়ারধারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কোনো ব্যক্তিকে ‘প্রতিনিধি পরিচালক’ হিসেবে পাঠাতে হলে, তাকে অবশ্যই সেই শেয়ারধারী মূল প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অথবা পর্ষদের পরিচালক পদে কর্মরত থাকতে হবে। এতদিন প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের ওপর কোনো বিশেষ শর্ত না থাকায় কোম্পানিগুলো তাদের ইচ্ছামতো যেকোনো বাইরের ব্যক্তিকেও মনোনীত করে ব্যাংকে পাঠাতে পারত, যা এখন থেকে বন্ধ হলো।
ব্যাংক-কোম্পানির মালিকানায় স্বচ্ছতা বিধান, আর্থিক সক্ষমতার অতিরিক্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ শেয়ার কেনা বন্ধ, প্রতিনিধি পরিচালকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সাধারণ আমানতকারীদের আমানতের নিরাপত্তা রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রজ্ঞাপনে আরও শর্ত যুক্ত করা হয়েছে যে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজ নামে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ২ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২০ শতাংশ দায়মুক্ত মালিকানা বা শেয়ারের অধিকারী হতে হবে। দায়িত্ব পালনের পুরো সময় জুড়েই এই ন্যূনতম শেয়ার ধরে রাখা বাধ্যতামূলক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে শেয়ারের এই মালিকানা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নিয়মিতভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে।


























