জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সুদৃঢ় করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতি, শিক্ষা, যুক্তি ও মানবতাকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মারণাস্ত্র নয়, বরং পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান ও সমঝোতার ভিত্তিতে একটি শান্তিময় এবং মানবিক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করা উচিত। ভাষণকালে তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
ভাষণে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। বিভিন্ন দেশ উন্নয়ন খাতের বাজেট কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করায় তা বিশ্বশান্তির প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক বিস্তার রোধে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্য দাবির প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন প্রকাশ করেন।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংস্কার কর্মসূচির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। বিগত আমলের গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ক্ষত সারিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে ফেরাতে সরকার রিকভারি, রেস্টোরেশন এবং রিকন্সট্রাকশন—অর্থাৎ ‘থ্রি-আর’ (3-R) কৌশল অনুসরণ করছে। সরকারের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) পূর্ণ সামঞ্জস্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মানবিক আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘকে সতর্ক করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটের বিচারে ব্যর্থ হলে তা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেন, এই সংকটের উদ্ভব ও সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত এবং তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী পথ। পাশাপাশি তিনি প্রবাসীদের অবদান স্বীকার করে নিরাপদ অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিবাসীদের অধিকার ও সুরক্ষা জোরদারের তাগিদ দেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ বা জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নগণ্য কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হয়েও বাংলাদেশকে সর্বাধিক পরিবেশগত ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং নদী ব্যবস্থাপনায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার কথা তিনি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। নারীদের ক্ষমতায়ন, বিনামূল্যে স্নাতক শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগের উদ্যোগের বিবরণও দেন। শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের উল্লেখ করে তিনি জানান, আগামী ৫ বছরে শিক্ষা খাতের বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পোশাক, ব্যাগ ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার চালু করা হচ্ছে। উদীয়মান প্রযুক্তির বিষয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনে এআই বিভাজনে পরিণত না হয়; সেজন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে জাতিসংঘের স্পষ্ট নীতিমালার তাগিদ দেন। পরিশেষে, “সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ” রূপকল্পকে সামনে রেখে একটি বৈষম্যহীন ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।






















