Dhaka ০৩:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলা: আদালতে জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন দুই আসামি

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৫৬:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় কর্মরত প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক দুই আসামি আদালতে সবিস্তারে নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতে দেওয়া ওই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মূলত তাজুল ইসলাম ছিলেন এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড বা পরিকল্পনাকারী। এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি মোট পাঁচজন দুষ্কৃতকারী অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে মূল শুটার তাজুল ইসলাম নিজে পিস্তল দিয়ে গুলি করে সাংবাদিক আলিফের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

গত রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়ার আদালতে আসামিরা এই জবানবন্দি প্রদান করেন। বিকেল পৌনে চারটায় শুরু হয়ে এই জুডিশিয়াল রেকর্ডিংয়ের প্রক্রিয়া চলে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। পরবর্তীতে বিচারকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী জবানবন্দি প্রদানকারী দুই আসামিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালতে জবানবন্দি দেওয়া দুই অভিযুক্ত হলেন—ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) এবং মো. সাব্বির আহম্মেদ (২৫)।

মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, আসামিরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন যে অভিযুক্ত তাজুল ইসলামের সঙ্গে নিহত সাংবাদিক আলিফের অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তীব্র বিরোধ চলছিল। মূলত সেই পুরোনো শত্রুতার জের ধরেই এই ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা তাজুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাঁদের পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমে সাংবাদিক আলিফ নিয়মিত বাধা সৃষ্টি করতেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গোপন তথ্য সরবরাহ করতেন। এছাড়া সীমান্তে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে আলিফকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে হবে বলেও তিনি দাবি জানিয়েছিলেন—এমন তথ্যও আসামিরা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। এসব নানা ক্ষোভ ও আক্রোশের কারণেই তাঁরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

ওসি আরও বলেন, দুই আসামির বিস্তারিত ভাষ্য অনুযায়ী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সরাসরি মোট পাঁচজন অংশ নিয়েছিলেন। অভিযুক্ত প্রধান পরিকল্পনাকারী তাজুল ইসলাম নিজেই অস্ত্র বের করে পিস্তল দিয়ে সাংবাদিক আলিফকে খুব কাছ থেকে গুলি করেন। আলিফের মৃত্যু পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

আসামিদের দেওয়া জবানবন্দিতে মূলহোতা তাজুল ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ওসি জানান, তদন্তের স্বার্থে এবং বাকি অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে এখনই তাঁদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত পাকড়াও করার লক্ষ্যেই এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামি বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাজুলের নাম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এছাড়া সহযোগী হিসেবে নিজেদের নাম ছাড়াও অন্য আরও কয়েকজনের নাম তাঁরা প্রকাশ করেছেন।

পুলিশ সুপার আরও জানান, সাংবাদিক হত্যা মামলার তদন্তের কাজ ইতোমধ্যে বহু দূর এগিয়ে গেছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে আর কারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্তভাবে জড়িত ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিত। খুব শীঘ্রই তাঁদের গ্রেপ্তার করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আসামিদের পুরোপুরি আইনের আওতায় আনার পর সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানানো হবে।

এর আগে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি চৌকস দল অভিযান চালিয়ে ইমরান ও সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করে। এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত মোট চারজন আসামিকে আটক করা হলো। এর আগে গত ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ নামের আরও দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।

নিহতের পরিবারের বর্তমান অবস্থা ও আকুতি: এদিকে স্বামী হত্যার পর চরম নিরাপত্তা সংকট ও অনিশ্চয়তার মাঝে থাকা নিহত সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা তাঁর দুই শিশুপুত্র ও বয়োবৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে বর্তমানে রাজধানীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। রাজধানীর ধানমন্ডির একটি সুপরিচিত বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে সম্প্রতি তাঁর একটি চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সম্মানিত ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের বিশেষ উদ্যোগে এই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে তিনি ওই হাসপাতালে তাঁর নতুন কর্মজীবন শুরু করেছেন।

নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বিচার দাবি করে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, “গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে আমার স্বামীর ওপর যখন প্রথম murderous হামলা চালানো হয়েছিল, তখন তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় আমাকে জানিয়েছিলেন যে, নদীর পাড়ের একটু দূরে তাজুল ইসলাম স্বয়ং হাতে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওই হামলায় ইমোন, সাব্বির ও সৌরভও সরাসরি অংশ নিয়েছিল বলে আমার স্বামী আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে গিয়েছিল।”

তিনি আরও দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমি সরকারের কাছে বিনীত ও জোরালো দাবি জানাই, মূল অভিযুক্ত তাজুল ইসলাম এবং শুটার শামীমসহ এই হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রতিটি আসামিকে যেন অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নৃশংস অপরাধ করার সাহস না পায়। আমি তো আমার স্বামীকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না; কিন্তু যারা তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে এবং আমার দুই নিষ্পাপ সন্তানকে চিরতরে এতিম ও আমাকে স্বামীহারা করেছে, আমি তাদের বুকফাটা কান্নার বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি তথা ফাঁসি নিজ চোখে দেখে যেতে চাই।”

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর গভীর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া নামক এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের। তিনি জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘রূপসী বাংলার’ নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ (Detective Article) নামের একটি প্রভাবশালী ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজের মাধ্যমে তিনি সীমান্তবর্তী এলাকার চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বেশ কিছু সাহসী ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। মূলত ওই পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সত্য প্রকাশের কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে জীবন দিতে হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ঘটনার পরদিন নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৭ থেকে ৮ জন দুষ্কৃতকারীকে আসামি করে দুর্গাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলা: আদালতে জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন দুই আসামি

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৫৬:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় কর্মরত প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটক দুই আসামি আদালতে সবিস্তারে নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতে দেওয়া ওই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মূলত তাজুল ইসলাম ছিলেন এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড বা পরিকল্পনাকারী। এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি মোট পাঁচজন দুষ্কৃতকারী অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে মূল শুটার তাজুল ইসলাম নিজে পিস্তল দিয়ে গুলি করে সাংবাদিক আলিফের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

গত রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়ার আদালতে আসামিরা এই জবানবন্দি প্রদান করেন। বিকেল পৌনে চারটায় শুরু হয়ে এই জুডিশিয়াল রেকর্ডিংয়ের প্রক্রিয়া চলে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। পরবর্তীতে বিচারকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী জবানবন্দি প্রদানকারী দুই আসামিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালতে জবানবন্দি দেওয়া দুই অভিযুক্ত হলেন—ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) এবং মো. সাব্বির আহম্মেদ (২৫)।

মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, আসামিরা বিজ্ঞ আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন যে অভিযুক্ত তাজুল ইসলামের সঙ্গে নিহত সাংবাদিক আলিফের অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তীব্র বিরোধ চলছিল। মূলত সেই পুরোনো শত্রুতার জের ধরেই এই ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা তাজুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাঁদের পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমে সাংবাদিক আলিফ নিয়মিত বাধা সৃষ্টি করতেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গোপন তথ্য সরবরাহ করতেন। এছাড়া সীমান্তে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে আলিফকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে হবে বলেও তিনি দাবি জানিয়েছিলেন—এমন তথ্যও আসামিরা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। এসব নানা ক্ষোভ ও আক্রোশের কারণেই তাঁরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

ওসি আরও বলেন, দুই আসামির বিস্তারিত ভাষ্য অনুযায়ী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সরাসরি মোট পাঁচজন অংশ নিয়েছিলেন। অভিযুক্ত প্রধান পরিকল্পনাকারী তাজুল ইসলাম নিজেই অস্ত্র বের করে পিস্তল দিয়ে সাংবাদিক আলিফকে খুব কাছ থেকে গুলি করেন। আলিফের মৃত্যু পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

আসামিদের দেওয়া জবানবন্দিতে মূলহোতা তাজুল ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ওসি জানান, তদন্তের স্বার্থে এবং বাকি অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া রোধ করতে এখনই তাঁদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত পাকড়াও করার লক্ষ্যেই এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামি বিজ্ঞ আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাজুলের নাম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এছাড়া সহযোগী হিসেবে নিজেদের নাম ছাড়াও অন্য আরও কয়েকজনের নাম তাঁরা প্রকাশ করেছেন।

পুলিশ সুপার আরও জানান, সাংবাদিক হত্যা মামলার তদন্তের কাজ ইতোমধ্যে বহু দূর এগিয়ে গেছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে আর কারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্তভাবে জড়িত ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিত। খুব শীঘ্রই তাঁদের গ্রেপ্তার করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আসামিদের পুরোপুরি আইনের আওতায় আনার পর সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানানো হবে।

এর আগে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি চৌকস দল অভিযান চালিয়ে ইমরান ও সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করে। এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত মোট চারজন আসামিকে আটক করা হলো। এর আগে গত ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ নামের আরও দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।

নিহতের পরিবারের বর্তমান অবস্থা ও আকুতি: এদিকে স্বামী হত্যার পর চরম নিরাপত্তা সংকট ও অনিশ্চয়তার মাঝে থাকা নিহত সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা তাঁর দুই শিশুপুত্র ও বয়োবৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে বর্তমানে রাজধানীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। রাজধানীর ধানমন্ডির একটি সুপরিচিত বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে সম্প্রতি তাঁর একটি চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সম্মানিত ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের বিশেষ উদ্যোগে এই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে তিনি ওই হাসপাতালে তাঁর নতুন কর্মজীবন শুরু করেছেন।

নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বিচার দাবি করে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, “গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে আমার স্বামীর ওপর যখন প্রথম murderous হামলা চালানো হয়েছিল, তখন তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় আমাকে জানিয়েছিলেন যে, নদীর পাড়ের একটু দূরে তাজুল ইসলাম স্বয়ং হাতে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওই হামলায় ইমোন, সাব্বির ও সৌরভও সরাসরি অংশ নিয়েছিল বলে আমার স্বামী আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে গিয়েছিল।”

তিনি আরও দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমি সরকারের কাছে বিনীত ও জোরালো দাবি জানাই, মূল অভিযুক্ত তাজুল ইসলাম এবং শুটার শামীমসহ এই হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রতিটি আসামিকে যেন অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নৃশংস অপরাধ করার সাহস না পায়। আমি তো আমার স্বামীকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না; কিন্তু যারা তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে এবং আমার দুই নিষ্পাপ সন্তানকে চিরতরে এতিম ও আমাকে স্বামীহারা করেছে, আমি তাদের বুকফাটা কান্নার বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি তথা ফাঁসি নিজ চোখে দেখে যেতে চাই।”

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর গভীর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া নামক এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের। তিনি জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘রূপসী বাংলার’ নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ (Detective Article) নামের একটি প্রভাবশালী ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজের মাধ্যমে তিনি সীমান্তবর্তী এলাকার চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বেশ কিছু সাহসী ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। মূলত ওই পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সত্য প্রকাশের কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে জীবন দিতে হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ঘটনার পরদিন নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৭ থেকে ৮ জন দুষ্কৃতকারীকে আসামি করে দুর্গাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।