Dhaka ০১:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও-১ ও সংরক্ষিত আসনের নবনির্বাচিত ২ সংসদ সদস্যের শপথগ্রহণ আজ

মাদরাসায় শারীরিক শাস্তি বা অনুপযুক্ত স্পর্শ গ্রহণযোগ্য নয়: আজহারী

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:৪৩:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৫ বার দেখা হয়েছে

দেশের কওমি ও আলিয়া মাদরাসাগুলোতে শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেদম বেত্রাঘাত কিংবা কোনো ধরনের অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন দেশের অন্যতম সুপরিচিত ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী। তাঁর মতে, ইদানীংকালে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে চলা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, যা সামগ্রিকভাবে পবিত্র মাদরাসা শিক্ষার ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে নিজের অফিশিয়াল ও ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি এসব কথা লেখেন।

পোস্টের শুরুতেই ড. আজহারী উল্লেখ করেন, এ দেশের পবিত্র মাটিতে দ্বীনি শিক্ষার প্রসার ও প্রচার ঘটানোর ক্ষেত্রে মাদরাসাগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকা অত্যন্ত অনস্বীকার্য। হাজার হাজার যোগ্য আলেম, হাফেজ, আলিমা এবং প্রকৃত দ্বীনদার ও আদর্শ প্রজন্ম গড়ে তোলার নেপথ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুগ যুগ ধরে অনন্য অবদান রেখে চলেছে। তাই সময়ের প্রয়োজনে মাদরাসা শিক্ষাকে আরও অধিক আধুনিক, শক্তিশালী, নিরাপদ এবং জনমানুষের কাছে আস্থাশীল করে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি লেখেন, “সম্প্রতি মাদরাসাকেন্দ্রিক বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই বাস্তবতায় দেশের প্রভাবশালী আলেমসমাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং মাদরাসা পরিচালনার সাথে সরাসরি যুক্ত সবার উচিত এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও আত্মসমালোচনামূলক বৈঠকে বসা। আমরা যদি নিজেদের ভুলত্রুটিগুলো নিজেদের উদ্যোগে সংশোধন না করি, তবে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ লুফে নেবে। ফলস্বরূপ, সামগ্রিকভাবে পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাই অযাচিত বাহ্যিক চাপ ও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।”

বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জনপ্রিয় এই বক্তা লেখেন, বিভিন্ন সময় মূলধারার মিডিয়ায় আমরা দেখতে পেয়েছি যে, দেশের আনাচে-কানাচে অস্বাস্থ্যকর ও অপরিসর পরিবেশে অসংখ্য মাদরাসা ও হিফজখানা গড়ে উঠেছে, যেগুলোতে নেই কোনো সিসি ক্যামেরা, নেই কোনো যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি। এমনকি সেখানে না রয়েছে মানসম্মত পরিবেশ, না আছে উন্নত কোনো পাঠদান ব্যবস্থা। প্রায়শই এসব নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানে ঘটে চলা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি লেখেন, দ্বীন শিক্ষা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে তা যাবতীয় জবাবদিহি, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং যেকোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং জবাবদিহিতা আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া উচিত। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সরকারি অনুমোদন, নিয়মিত নিবন্ধন, মানসম্মত ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো, শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, দক্ষ পরিচালনা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সঠিক আচরণ ও পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণে শিশুর মনস্তত্ত্ব বা চাইল্ড সাইকোলজি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণাও রাখা আবশ্যক।

শিশুদের বয়স, মানসিক বিকাশ ও আবেগের ভিন্নতা তুলে ধরে তিনি আরও লেখেন, শিশুদের বয়সভেদে শেখার ধরন ও মানসিকতা একেক রকম হয়ে থাকে। তাই একজন শিক্ষককে কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ হলেই চলবে না; বরং শিশুদের কচি মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের সঙ্গে বয়সোপযোগী ও মানবিক আচরণ করার মানসিক সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। বিশেষ করে আবাসিক মাদরাসাগুলোর ক্ষেত্রে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা এবং একটি আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও বেশি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষক নিবন্ধন প্রক্রিয়া, যেকোনো অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠোর ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের মতো শাস্তিমূলক পদক্ষেপগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মাদরাসায় শাস্তির নামে নির্যাতন প্রসঙ্গে ড. আজহারী লেখেন, মাদরাসাগুলোতে শৃঙ্খলা শেখানোর নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত এবং নানা ধরনের টর্চারের ঘটনা মাঝেমধ্যেই খবরের শিরোনাম হয়। এই অমানবিক ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে দ্বীনি শিক্ষার প্রতি একধরনের নেতিবাচক ধারণা ও ভীতি জন্ম দিচ্ছে। এমন যেকোনো আচরণ, যা একটি শিশুর কোমল মনে তীব্র ভয়, চরম অপমান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা বা আতঙ্ক সৃষ্টি করে—তা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। কড়া শৃঙ্খলা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে চরম প্রজ্ঞা, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং মানবতাবাদের মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। জোরপূর্বক কোনো কিছু শিশুর মাথায় চাপিয়ে দেওয়ার নাম প্রকৃত শিক্ষা নয়; বরং শিক্ষা হলো একটি শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। এক্ষেত্রে প্রতিটি মাদরাসায় একটি করে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বা ‘চাইল্ড সেফটি পলিসি’ প্রণয়ন ও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই নীতিমালায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ আচরণের সীমানা, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্ট অক্ষরে উল্লেখ থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো রকম ভয়ভীতি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া নির্ভয়ে নিজেদের অভিযোগ জানাতে পারে, সেজন্য একটি নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় ও সম্মান রক্ষা করাও জরুরি। গুরুতর নির্যাতনের মতো কোনো ঘটনা অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা না দিয়ে তা যথাযথ আইনি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে অবহিত করা এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সীমানা নির্ধারণের ওপর জোর দিয়ে তিনি লেখেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের একটি সুস্পষ্ট ও নিরাপদ সীমারেখা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। শাসনের নামে শিক্ষার্থীদের মনে ভয় দেখানো, অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি কিংবা কোনো ধরনের অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও আত্মমর্যাদার সুরক্ষার পাশাপাশি একান্তে সাক্ষাৎ কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদান—সবক্ষেত্রেই নিরাপদ ও পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, যেকোনো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ব্যক্তি যাতে পুনরায় একই ধরনের সংবেদনশীল দায়িত্বে পুনর্বাসিত হতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও সমানভাবে জরুরি। এক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, মাদরাসা পরিচালনা কমিটি, সচেতন অভিভাবক সমাজ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং শিশু সুরক্ষায় নিবেদিত বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও অবকাঠামোগত সামর্থ্য সীমিত, সেই সমস্ত প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা নিশ্চিত করা উচিত।

সংস্কারের প্রকৃত অর্থ বুঝিয়ে তিনি লেখেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের সংস্কার আনার মূল লক্ষ্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল বা হেয় করা নয়; বরং তাদের সুপ্ত সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, মানসম্মত এবং জনআস্থার প্রতীক হিসেবে একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

পরিশেষে নিজের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ টেনে ড. মিজানুর রহমান আজহারী লেখেন, আমাদের এই বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা কোনোভাবেই মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো অপপ্রচার নয়; বরং এটি পবিত্র মাদরাসা শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা এবং দ্বীনি শিক্ষার ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষার একান্ত স্বার্থেই করা হয়েছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য বা সুনামের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা, শিক্ষকদের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা এবং সামগ্রিক পরিচালনা ব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর। নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা সাহসের সাথে স্বীকার করে আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি এবং সংস্কারের সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটিই প্রকৃত দায়িত্বশীলতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। দ্বীনি শিক্ষার পবিত্র মর্যাদা এবং সমাজের বৃহত্তর আস্থার জায়গাটি অক্ষুণ্ণ রাখতে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

জনপ্রিয়

প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ বন্ধ থাকবে ২৪ ঘণ্টা, ডেসকোর জরুরি নির্দেশনা

মাদরাসায় শারীরিক শাস্তি বা অনুপযুক্ত স্পর্শ গ্রহণযোগ্য নয়: আজহারী

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:৪৩:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

দেশের কওমি ও আলিয়া মাদরাসাগুলোতে শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেদম বেত্রাঘাত কিংবা কোনো ধরনের অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন দেশের অন্যতম সুপরিচিত ইসলামিক চিন্তাবিদ ও বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী। তাঁর মতে, ইদানীংকালে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে চলা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রীতিকর ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, যা সামগ্রিকভাবে পবিত্র মাদরাসা শিক্ষার ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে নিজের অফিশিয়াল ও ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি এসব কথা লেখেন।

পোস্টের শুরুতেই ড. আজহারী উল্লেখ করেন, এ দেশের পবিত্র মাটিতে দ্বীনি শিক্ষার প্রসার ও প্রচার ঘটানোর ক্ষেত্রে মাদরাসাগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকা অত্যন্ত অনস্বীকার্য। হাজার হাজার যোগ্য আলেম, হাফেজ, আলিমা এবং প্রকৃত দ্বীনদার ও আদর্শ প্রজন্ম গড়ে তোলার নেপথ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুগ যুগ ধরে অনন্য অবদান রেখে চলেছে। তাই সময়ের প্রয়োজনে মাদরাসা শিক্ষাকে আরও অধিক আধুনিক, শক্তিশালী, নিরাপদ এবং জনমানুষের কাছে আস্থাশীল করে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি লেখেন, “সম্প্রতি মাদরাসাকেন্দ্রিক বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই বাস্তবতায় দেশের প্রভাবশালী আলেমসমাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং মাদরাসা পরিচালনার সাথে সরাসরি যুক্ত সবার উচিত এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও আত্মসমালোচনামূলক বৈঠকে বসা। আমরা যদি নিজেদের ভুলত্রুটিগুলো নিজেদের উদ্যোগে সংশোধন না করি, তবে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ লুফে নেবে। ফলস্বরূপ, সামগ্রিকভাবে পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাই অযাচিত বাহ্যিক চাপ ও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।”

বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জনপ্রিয় এই বক্তা লেখেন, বিভিন্ন সময় মূলধারার মিডিয়ায় আমরা দেখতে পেয়েছি যে, দেশের আনাচে-কানাচে অস্বাস্থ্যকর ও অপরিসর পরিবেশে অসংখ্য মাদরাসা ও হিফজখানা গড়ে উঠেছে, যেগুলোতে নেই কোনো সিসি ক্যামেরা, নেই কোনো যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি। এমনকি সেখানে না রয়েছে মানসম্মত পরিবেশ, না আছে উন্নত কোনো পাঠদান ব্যবস্থা। প্রায়শই এসব নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানে ঘটে চলা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি লেখেন, দ্বীন শিক্ষা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে তা যাবতীয় জবাবদিহি, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং যেকোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং জবাবদিহিতা আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া উচিত। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সরকারি অনুমোদন, নিয়মিত নিবন্ধন, মানসম্মত ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো, শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, দক্ষ পরিচালনা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সঠিক আচরণ ও পাঠদান পদ্ধতি নির্ধারণে শিশুর মনস্তত্ত্ব বা চাইল্ড সাইকোলজি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণাও রাখা আবশ্যক।

শিশুদের বয়স, মানসিক বিকাশ ও আবেগের ভিন্নতা তুলে ধরে তিনি আরও লেখেন, শিশুদের বয়সভেদে শেখার ধরন ও মানসিকতা একেক রকম হয়ে থাকে। তাই একজন শিক্ষককে কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ হলেই চলবে না; বরং শিশুদের কচি মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের সঙ্গে বয়সোপযোগী ও মানবিক আচরণ করার মানসিক সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। বিশেষ করে আবাসিক মাদরাসাগুলোর ক্ষেত্রে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা এবং একটি আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও বেশি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষক নিবন্ধন প্রক্রিয়া, যেকোনো অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠোর ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের মতো শাস্তিমূলক পদক্ষেপগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মাদরাসায় শাস্তির নামে নির্যাতন প্রসঙ্গে ড. আজহারী লেখেন, মাদরাসাগুলোতে শৃঙ্খলা শেখানোর নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত এবং নানা ধরনের টর্চারের ঘটনা মাঝেমধ্যেই খবরের শিরোনাম হয়। এই অমানবিক ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে দ্বীনি শিক্ষার প্রতি একধরনের নেতিবাচক ধারণা ও ভীতি জন্ম দিচ্ছে। এমন যেকোনো আচরণ, যা একটি শিশুর কোমল মনে তীব্র ভয়, চরম অপমান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা বা আতঙ্ক সৃষ্টি করে—তা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। কড়া শৃঙ্খলা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে চরম প্রজ্ঞা, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং মানবতাবাদের মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। জোরপূর্বক কোনো কিছু শিশুর মাথায় চাপিয়ে দেওয়ার নাম প্রকৃত শিক্ষা নয়; বরং শিক্ষা হলো একটি শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। এক্ষেত্রে প্রতিটি মাদরাসায় একটি করে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বা ‘চাইল্ড সেফটি পলিসি’ প্রণয়ন ও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই নীতিমালায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ আচরণের সীমানা, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্ট অক্ষরে উল্লেখ থাকতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো রকম ভয়ভীতি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া নির্ভয়ে নিজেদের অভিযোগ জানাতে পারে, সেজন্য একটি নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় ও সম্মান রক্ষা করাও জরুরি। গুরুতর নির্যাতনের মতো কোনো ঘটনা অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা না দিয়ে তা যথাযথ আইনি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে অবহিত করা এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সীমানা নির্ধারণের ওপর জোর দিয়ে তিনি লেখেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের একটি সুস্পষ্ট ও নিরাপদ সীমারেখা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। শাসনের নামে শিক্ষার্থীদের মনে ভয় দেখানো, অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি কিংবা কোনো ধরনের অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও আত্মমর্যাদার সুরক্ষার পাশাপাশি একান্তে সাক্ষাৎ কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদান—সবক্ষেত্রেই নিরাপদ ও পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি লেখেন, যেকোনো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ব্যক্তি যাতে পুনরায় একই ধরনের সংবেদনশীল দায়িত্বে পুনর্বাসিত হতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা থাকা উচিত। তবে অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও সমানভাবে জরুরি। এক্ষেত্রে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, মাদরাসা পরিচালনা কমিটি, সচেতন অভিভাবক সমাজ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং শিশু সুরক্ষায় নিবেদিত বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও অবকাঠামোগত সামর্থ্য সীমিত, সেই সমস্ত প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা নিশ্চিত করা উচিত।

সংস্কারের প্রকৃত অর্থ বুঝিয়ে তিনি লেখেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের সংস্কার আনার মূল লক্ষ্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল বা হেয় করা নয়; বরং তাদের সুপ্ত সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, মানসম্মত এবং জনআস্থার প্রতীক হিসেবে একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

পরিশেষে নিজের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ টেনে ড. মিজানুর রহমান আজহারী লেখেন, আমাদের এই বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা কোনোভাবেই মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো অপপ্রচার নয়; বরং এটি পবিত্র মাদরাসা শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা এবং দ্বীনি শিক্ষার ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষার একান্ত স্বার্থেই করা হয়েছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য বা সুনামের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা, শিক্ষকদের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা এবং সামগ্রিক পরিচালনা ব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর। নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা সাহসের সাথে স্বীকার করে আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি এবং সংস্কারের সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়া কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটিই প্রকৃত দায়িত্বশীলতার সবচেয়ে বড় পরিচয়। দ্বীনি শিক্ষার পবিত্র মর্যাদা এবং সমাজের বৃহত্তর আস্থার জায়গাটি অক্ষুণ্ণ রাখতে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।