শিক্ষাঙ্গনে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার সার্বিক গুণগত মান সুসংহত করতে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন করছে সরকার। প্রস্তাবিত এই বিধিমালায় শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া এবং শিক্ষা-বহির্ভূত অন্য কোনো পেশা বা ব্যবসায় যুক্ত থাকার ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা ও নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার মানোন্নয়ন পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রদত্ত নির্দেশনার পর নতুন আচরণবিধির খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সেই সভায় মাধ্যমিক শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা, ঝরে পড়ার হার কমানো ও শৃঙ্খলার বিষয়গুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়—দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, লাগামহীন কোচিংনির্ভরতা, স্মার্টফোনে আসক্তি এবং আনন্দময় শিক্ষার অভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়বিমুখ হচ্ছে। সার্বিক মূল্যায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৫ দফা অনুশাসন সংবলিত ‘রেকর্ড অব নোটস’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, যার অন্যতম মূল তাগিদ ছিল শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা।
প্রস্তাবিত নতুন আচরণবিধি কার্যকর হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দলীয় কোনো পদ-পদবি ধারণ করা, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী বা প্রচারক হিসেবে অংশ নেওয়ার বিষয়টি কঠোর আইনি কাঠামোর আওতায় আসবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অতীতে বহু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখা ও দলীয় কর্মসূচিতে বেশি সময় ব্যয় করেছেন, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ফলাফলে। এ কারণে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এই বিধিনিষেধ সময়ের অতি প্রয়োজনীয় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু রাজনীতিই নয়, শিক্ষকতা পেশার বাইরে অন্যান্য ব্যবসা বা লাভজনক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা—যা পাঠদান ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে—সেসবের ওপরও কড়াকড়ি আসতে পারে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান বাড়াতে দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষকদের উপস্থিতি ও পাঠদান তদারকিতে যুক্ত করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। এর অংশ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সহকারী পরিচালকেরা ‘ডিএমএস (DMS) অ্যাপ’-এর মাধ্যমে সরাসরি ভিডিও কলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রধান শিক্ষকদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখা হবে।
এছাড়া গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক সংকট কাটাতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য সম্পর্কে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, শিক্ষকতা নিছক কোনো সাধারণ চাকরি নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। নতুন বিধিমালার উদ্দেশ্য শিক্ষকদের অযথা নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং পেশাগত সম্মান ধরে রাখা এবং দায়িত্বের সঠিক রূপরেখা তৈরি করা। শিক্ষকেরা যাতে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে নিজেদের মেধা ও আন্তরিকতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারেন, সেই শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভালো পারফরম্যান্সের জন্য লেখকদের যেমন মূল্যায়িত করা হবে, তেমনই এই নীতিমালার মাধ্যমে পেশাগত শৃঙ্খলা ও সক্ষমতা দুটোই বৃদ্ধি পাবে।






















