Dhaka ০২:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
পুলিশকে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বের করে আনা হয়েছে: তথ্য উপদেষ্টা ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনে ব্যাপক জালিয়াতি, জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করল নির্বাচন কমিশন

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১২:৫১:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ বার দেখা হয়েছে

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের প্রচলিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ থেকে অবৈধভাবে সম্পত্তি জবরদখল বা বিক্রি, উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশ দাবি এবং অন্যান্য দাপ্তরিক ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে অভিনব জালিয়াতির চেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় অভিযুক্ত একাধিক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা দায়েরসহ তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের কঠোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে বলে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্বশীল শীর্ষ কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “এই ধরনের গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগে আমাদের বহু অসাধু কর্মকর্তা ইতিমধ্যে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আমরা সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছি এবং তাঁদের দ্রুত গ্রেপ্তারের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে কমিশন কোনোভাবেই কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিচ্ছে না।”

ইসি সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো ধরনের জালিয়াতি ও প্রতারণা পুরোপুরি রোধ করতে নির্বাচন কমিশন বর্তমানে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেছে। আবেদনকৃত তথ্যের সপক্ষে প্রয়োজনীয় ও শতভাগ নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ এবং দাপ্তরিক নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হওয়ার পরই কেবল সংশোধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি আবেদনকারীকে সংশোধনের স্বপক্ষে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য এবং শক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণপত্র দাখিল করতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এনআইডি কার্ডের অপব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, “অনেকেই অত্যন্ত সুচতুরভাবে নিজের আসল নাম ও পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করে অন্যের সম্পত্তি অবৈধভাবে বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া উত্তরাধিকারী বা ওয়ারিশ হিসেবে নিজেদের আইনগতভাবে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেও জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এছাড়া অনেকে প্রতারণার মাধ্যমে পাসপোর্ট জালিয়াতি বা পরিবর্তন করারও অপচেষ্টা চালান। আর এসব কারণেই কোনো ধরনের নিবিড় যাচাই-বাছাই বা তদন্ত সম্পন্ন না করে হুট করে কোনো আবেদন সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন বা সংশোধন করে দেওয়া একেবারেই সম্ভব নয়।”

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ: নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনআইডি জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠী জেলার কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে ইসি। এর পাশাপাশি একই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকেও বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া বা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আবেদনপত্রে প্রাপ্ত অসংগতিসমূহ: ইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বহু আবেদনপত্রে মারাত্মক ও হাস্যকর সব অসংগতি ধরা পড়ছে। যেমন—অনেক জন্মনিবন্ধন বা পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদনে পিতা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর কিংবা মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান দেখানো হয়েছে মাত্র দুই থেকে তিন বছর। এছাড়া অনেক আবেদনকারীর একাধিক ভিন্ন জন্মনিবন্ধন সনদ কিংবা ভুয়া শিক্ষাগত সনদ থাকার তথ্যও সামনে আসছে।

বিশেষজ্ঞ ও ইসি কর্মকর্তারা মনে করেন, যথাযথ ও গভীর যাচাই-বাছাই না করে হুট করে এসব আবেদন অনুমোদন করা হলে ভবিষ্যতে মারাত্মক আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এছাড়া ভুয়া বা জালিয়াতির পরিচয়ে নতুন এনআইডি কার্ড সংগ্রহের বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও এর সঙ্গে জড়িত।

এ বিষয়ে সিইসি আরও সতর্ক করে বলেন, “এমনকি বহুবার এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যও আমাদের কানে এসেছে যে, বিদেশি নাগরিক কিংবা রোহিঙ্গারা নানা উপায়ে অবৈধভাবে আমাদের দেশের নাগরিক সেজে ভুয়া এনআইডি কার্ড তৈরি করে ফেলেছে। এই ধরনের মারাত্মক ঝুঁকি এড়ানোর জন্যই প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই, মাঠপর্যায়ে তদন্ত এবং উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।”

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে আলোকপাত করে জানান যে, অনেক আবেদনকারী এমন অবাস্তব জন্মতারিখ পরিবর্তনের অনুরোধ জানান, যা তাদের পূর্বের মূল নিবন্ধনের প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ও অসম্ভব।

একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “ধরুন, কোনো একজন ব্যক্তির জন্মসাল হলো ১৯৯৭ সালে এবং তিনি ২০১৫ সালে তাঁর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আইনগতভাবে ভোটার হয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তাঁর মূল জন্মসাল পরিবর্তন করে ২০০২ সাল করতে চান। এখন যদি হিসাব করা হয়, তবে নিবন্ধনের নিয়মানুযায়ী ২০০২ সালে জন্ম হলে ভোটার হওয়ার সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১৩ বছর, অথচ আমাদের দেশের নিয়ম অনুযায়ী ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৮ বছর। এ ধরনের একটি অবাস্তব ও সাংঘর্ষিক আবেদন কীভাবে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে?”

সচিব আরও যোগ করেন যে, অনেক আবেদনকারী বিদেশে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট জটিলতা কিংবা ব্যক্তিগত বিভিন্ন জরুরি অসুবিধার কথা উল্লেখ করে ‘মানবিক বিবেচনা’র ধুয়ো তুলে এনআইডি দ্রুত সংশোধনের অনুরোধ জানান। কিন্তু উপযুক্ত ও সত্যতা যাচাই না করে এ ধরনের আবেদন অনুমোদন করা হলে শেষ পর্যন্ত তা নির্বাচন কমিশনকেই বড় ধরনের আইনি বিপদের মুখে ফেলে দেয়।

যেসব দাপ্তরিক নথি নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়: ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ ও প্রাথমিক পর্যায়ের অধিকাংশ সংশোধন আবেদন এখন উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। তবে নাম পরিবর্তন, পিতা-মাতার নাম সংশোধন কিংবা জন্মতারিখ পরিবর্তনের মতো একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক তথ্য একসঙ্গে সংশোধনের জটিল ও সংবেদনশীল আবেদনগুলো সরাসরি উচ্চপর্যায়ে প্রেরণ করা হয়। সেখানে জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত ও একাডেমিক সনদসহ প্রতিটি প্রাসঙ্গিক সরকারি নথি অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। বিশেষ করে পিতার নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পিতার নিজস্ব এনআইডি কার্ড এবং পরিবারের অন্যান্য ভাই-বোনের দাপ্তরিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, কেবল একটি সাধারণ হলফনামার বা এফিডেভিটের আইনি ভিত্তির ওপর নির্ভর করে জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনো মৌলিক তথ্য সংশোধন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্পষ্ট করে বলেন, “আপনি যদি আপনার নিজের নাম কিংবা আপনার বাবার নাম পরিবর্তন করতে চান, তবে আমরা স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারি যে আপনার পরিবারের অন্য ভাই-বোনদের এনআইডি কার্ডগুলো নিয়ে আসেন। তাঁদের এনআইডি কার্ডে আপনাদের বাবার নাম অবিকল কী লেখা রয়েছে, তা আমরা মিলিয়ে দেখতে চাই।” প্রতিটি তথ্যের শতভাগ যথার্থতা ও সত্যতা প্রমাণের জন্যই মূলত এই অতিরিক্ত তথ্যগুলো তলব করা হয় বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

ইসি সচিবালয়ে প্রবেশে কড়াকড়ি: এদিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে একটি নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এখন থেকে ইসি সচিবালয় ভবন চত্বরে প্রবেশ করার পর এবং পুরো অবস্থানকালে প্রতিটি দর্শনার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁদের নিজস্ব পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড দৃশ্যমান ও ঝোলানো অবস্থায় রাখতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী নাগরিকদের বিভিন্ন অভিযোগ: অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ ভুক্তভোগী নাগরিকদের পক্ষ থেকেও নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি যশোরের কেশবপুর এলাকা থেকে এনআইডি সংশোধন করতে আসা হরিদাশ কর্মকার (ছদ্মনাম) নামের এক সেবাগ্রহীতা জানান, তিনি বিগত প্রায় ছয় মাস আগে তাঁর স্ত্রীর নাম সংশোধনের জন্য যথাযথ নিয়মে অনলাইনে আবেদন করেছেন।

প্রাথমিক প্রক্রিয়ার সময় তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, তাঁর স্ত্রীর নামে সিস্টেমে দুটি আলাদা জন্মনিবন্ধন নম্বর রয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো একটি অপ্রয়োজনীয় জন্মনিবন্ধন সম্পূর্ণ বাতিল করে সার্টিফিকেট নিয়ে আসলে তাঁর নাম সংশোধন করে দেওয়া হবে। এরপর তিনি দীর্ঘ দৌড়ঝাঁপ করে একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে যখন পুনরায় ইসিতে আসেন, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নতুন করে জানান যে, নাম সংশোধনের জন্য তাঁর স্ত্রীর ভাই ও বোনের অফিশিয়াল প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের ছাপসহ আরও বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত নথিপত্র ও দাপ্তরিক ডকুমেন্টের দাবি করা হয়, যা তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংগ্রহ করতে পারেননি এবং এ কারণে তাঁর কাজ এখনো ঝুলে আছে।

১৩ লাখের বেশি আবেদন বাতিল: নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশ থেকে এ পর্যন্ত জমা পড়া মোট ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন আবেদনের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি আবেদন সফলভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট কারণে সর্বমোট ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন সম্পূর্ণভাবে বাতিল বা খারিজ করা হয়েছে।

আবেদন বিপুল পরিমাণে বাতিলের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে সিইসি বলেন, “মূলত প্রয়োজনীয় ও সঠিক তথ্যের অভাব, বৈধ জন্মসনদের ঘাটতি এবং তথ্যের অমিলের কারণেই এই আবেদনগুলো বাতিল করা হয়েছে।” অনেকের ক্ষেত্রে একাধিক ভিন্ন জন্মসনদ, এসএসসি বা উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটের জন্মতারিখ ভিন্ন থাকায় যেকোনো একটি মাত্র ডকুমেন্টের ওপর শতভাগ নির্ভর করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া নির্বাচন কমিশনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে পরিষ্কার করে জানান যে, বাতিলের মোট এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে এত বিশাল সংখ্যক আলাদা আবেদনকারী সরাসরি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর বড় একটি কারণ হলো, একই আবেদনকারী হয়তো নিজের অজান্তেই কিংবা ভুল সংশোধনের আশায় চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত একই আবেদন পুনরায় সাবমিট করেছেন। আবার একটিমাত্র একক আবেদনে একাধিক ভিন্ন তথ্য সংশোধনের অনুরোধ করা হলে, হয়তো একটি তথ্য সংশোধনযোগ্য হলেও অন্য তথ্যগুলোর অসঙ্গতির কারণে পুরো আবেদনটিই কারিগরি ও আইনি কারণে বাতিল করতে হয়েছে।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আরও যোগ করেন যে, উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায় পর্যন্ত আবেদন বাতিল হওয়ার পরও সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা চাইলে সর্বশেষ সচিব মহোদয় বরাবর উচ্চতর আপিল করার সুযোগ পান, সেখানেও যথাযথ নথির অভাবে আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু আবেদন প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে ছয় থেকে সাতবার পর্যন্তও বাতিল হয়েছে। ফলস্বরূপ, কেবল বাতিলের এই মোট সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বা ভুক্তভোগী আবেদনকারীর সঠিক সংখ্যা কখনোই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

প্রবাসীদের নানামুখী জটিলতা ও বিশেষ উদ্যোগ: বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানামুখী সেবা দ্রুত ও সহজ করার জন্য নির্বাচন কমিশন আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যাঁদের সমস্ত कागপত্র ও দাপ্তরিক কাগজপত্র শতভাগ সঠিক রয়েছে, তাঁদের জমা দেওয়া আবেদনগুলো అత్యান্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিইসি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে প্রবাসীদের জন্য ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছি।”

তবে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে নানা জালিয়াতির বিষয় তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “অনেকেই একসময় সঠিক ও বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে হয়তো বিদেশে যাননি, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন অসৎ দালালচক্রের মাধ্যমে অনিয়মিত উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এসব বিষয় ও ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই রকম গুরুতর রিপোর্ট আসছে যে, বেশ কিছু রোহিঙ্গা নাগরিক সুচতুরভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে সেখানে অবৈধভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।”

প্রবাসীদের দেশের ‘অর্থনৈতিক লাইফলাইন’ হিসেবে অভিহিত করে সিইসি জোরালোভাবে বলেন, “যদি কোনো প্রবাসী নাগরিকের সমস্ত দাপ্তরিক তথ্য ও কাগজপত্র সম্পূর্ণ ঠিকঠাক থাকে, তবে আমরা অবশ্যই ন্যূনতম সময়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করার সর্বাত্মক চেষ্টা করব। কারণ আমাদের প্রবাসীরা হলেন আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তি বা লাইফলাইন। আমরা তাঁদের যেকোনো সেবা যতটা সম্ভব ‘ভিআইপি মর্যাদায়’ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে আরও যোগ করেন যে, অতীতে বহু প্রবাসী দেশে থাকাকালীন সাধারণ এনআইডি কার্ড তৈরি করলেও পরবর্তীতে বিদেশে যাওয়ার তাগিদে সম্পূর্ণ ভিন্ন জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি করেন, যার ফলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের তথ্যের মধ্যে ব্যাপক অমিল বা অসঙ্গতি তৈরি হয়। সাধারণত নতুন জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির সময় যদি প্রার্থীরা পূর্বের এনআইডি কার্ডের তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে তা তৈরি করতেন, তবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব হতো।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন কর্মসংস্থানমুখী দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সের কঠোর শর্ত বা বয়সসীমা থাকায় অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে বিদেশে যাওয়ার সুবিধার্থে নিজেদের বয়সসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করেন। পরবর্তীতে যখন তারা বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন বড় ধরনের আইনি বা দাপ্তরিক সমস্যায় পড়েন, তখন দেশে ফিরে নিজেদের প্রকৃত বয়স ঠিক করার জন্য বাবা কিংবা মায়ের নাম বা জন্মতারিখ পরিবর্তনের অযৌক্তিক ও জটিল আবেদন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দারস্থ হন।

কোন সংশোধন প্রক্রিয়া সহজ এবং কোনটি জটিল: নির্বাচন কমিশনের মূল লক্ষ্য ও নীতি হলো—নাগরিকেরা যেন ভোটার নিবন্ধনের প্রাথমিক ধাপেই সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য ও নির্ভুল নথিপত্র প্রদান করেন, যাতে পরবর্তীতে জীবনের কোনো পর্যায়েই অপ্রয়োজনীয়ভাবে এনআইডি সংশোধনের কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে না হয়।

সাধারণ নিয়মানুযায়ী, কেবল স্থানান্তরের কারণে আবাসিক ঠিকানা পরিবর্তন, বিবাহ বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন কিংবা আইনগত প্রক্রিয়ায় নিজ ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে তুলনামূলক সহজে ও দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মোড. সাইফুল ইসলাম বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানান যে, ব্যক্তির নিজের নাম, বাবা কিংবা মায়ের আসল পরিচয় কিংবা জন্মতারিখের মতো অত্যন্ত মৌলিক ও সংবেদনশীল তথ্যগুলো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধে প্রতিটি তথ্য ও দাপ্তরিক প্রমাণ অত্যন্ত কঠোরভাবে এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন।

জনপ্রিয়

পুলিশকে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বের করে আনা হয়েছে: তথ্য উপদেষ্টা

জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনে ব্যাপক জালিয়াতি, জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করল নির্বাচন কমিশন

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১২:৫১:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের প্রচলিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ থেকে অবৈধভাবে সম্পত্তি জবরদখল বা বিক্রি, উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশ দাবি এবং অন্যান্য দাপ্তরিক ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে অভিনব জালিয়াতির চেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় অভিযুক্ত একাধিক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা দায়েরসহ তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের কঠোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে বলে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্বশীল শীর্ষ কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “এই ধরনের গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগে আমাদের বহু অসাধু কর্মকর্তা ইতিমধ্যে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আমরা সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছি এবং তাঁদের দ্রুত গ্রেপ্তারের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়ে কমিশন কোনোভাবেই কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিচ্ছে না।”

ইসি সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো ধরনের জালিয়াতি ও প্রতারণা পুরোপুরি রোধ করতে নির্বাচন কমিশন বর্তমানে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেছে। আবেদনকৃত তথ্যের সপক্ষে প্রয়োজনীয় ও শতভাগ নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ এবং দাপ্তরিক নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হওয়ার পরই কেবল সংশোধনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি আবেদনকারীকে সংশোধনের স্বপক্ষে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য এবং শক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণপত্র দাখিল করতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এনআইডি কার্ডের অপব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, “অনেকেই অত্যন্ত সুচতুরভাবে নিজের আসল নাম ও পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করে অন্যের সম্পত্তি অবৈধভাবে বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া উত্তরাধিকারী বা ওয়ারিশ হিসেবে নিজেদের আইনগতভাবে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেও জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এছাড়া অনেকে প্রতারণার মাধ্যমে পাসপোর্ট জালিয়াতি বা পরিবর্তন করারও অপচেষ্টা চালান। আর এসব কারণেই কোনো ধরনের নিবিড় যাচাই-বাছাই বা তদন্ত সম্পন্ন না করে হুট করে কোনো আবেদন সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন বা সংশোধন করে দেওয়া একেবারেই সম্ভব নয়।”

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ: নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনআইডি জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠী জেলার কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে ইসি। এর পাশাপাশি একই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকেও বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া বা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আবেদনপত্রে প্রাপ্ত অসংগতিসমূহ: ইসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বহু আবেদনপত্রে মারাত্মক ও হাস্যকর সব অসংগতি ধরা পড়ছে। যেমন—অনেক জন্মনিবন্ধন বা পরিচয়পত্র সংশোধনের আবেদনে পিতা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর কিংবা মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান দেখানো হয়েছে মাত্র দুই থেকে তিন বছর। এছাড়া অনেক আবেদনকারীর একাধিক ভিন্ন জন্মনিবন্ধন সনদ কিংবা ভুয়া শিক্ষাগত সনদ থাকার তথ্যও সামনে আসছে।

বিশেষজ্ঞ ও ইসি কর্মকর্তারা মনে করেন, যথাযথ ও গভীর যাচাই-বাছাই না করে হুট করে এসব আবেদন অনুমোদন করা হলে ভবিষ্যতে মারাত্মক আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এছাড়া ভুয়া বা জালিয়াতির পরিচয়ে নতুন এনআইডি কার্ড সংগ্রহের বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও এর সঙ্গে জড়িত।

এ বিষয়ে সিইসি আরও সতর্ক করে বলেন, “এমনকি বহুবার এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যও আমাদের কানে এসেছে যে, বিদেশি নাগরিক কিংবা রোহিঙ্গারা নানা উপায়ে অবৈধভাবে আমাদের দেশের নাগরিক সেজে ভুয়া এনআইডি কার্ড তৈরি করে ফেলেছে। এই ধরনের মারাত্মক ঝুঁকি এড়ানোর জন্যই প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই, মাঠপর্যায়ে তদন্ত এবং উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।”

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে আলোকপাত করে জানান যে, অনেক আবেদনকারী এমন অবাস্তব জন্মতারিখ পরিবর্তনের অনুরোধ জানান, যা তাদের পূর্বের মূল নিবন্ধনের প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ও অসম্ভব।

একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “ধরুন, কোনো একজন ব্যক্তির জন্মসাল হলো ১৯৯৭ সালে এবং তিনি ২০১৫ সালে তাঁর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আইনগতভাবে ভোটার হয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তাঁর মূল জন্মসাল পরিবর্তন করে ২০০২ সাল করতে চান। এখন যদি হিসাব করা হয়, তবে নিবন্ধনের নিয়মানুযায়ী ২০০২ সালে জন্ম হলে ভোটার হওয়ার সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১৩ বছর, অথচ আমাদের দেশের নিয়ম অনুযায়ী ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৮ বছর। এ ধরনের একটি অবাস্তব ও সাংঘর্ষিক আবেদন কীভাবে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে?”

সচিব আরও যোগ করেন যে, অনেক আবেদনকারী বিদেশে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট জটিলতা কিংবা ব্যক্তিগত বিভিন্ন জরুরি অসুবিধার কথা উল্লেখ করে ‘মানবিক বিবেচনা’র ধুয়ো তুলে এনআইডি দ্রুত সংশোধনের অনুরোধ জানান। কিন্তু উপযুক্ত ও সত্যতা যাচাই না করে এ ধরনের আবেদন অনুমোদন করা হলে শেষ পর্যন্ত তা নির্বাচন কমিশনকেই বড় ধরনের আইনি বিপদের মুখে ফেলে দেয়।

যেসব দাপ্তরিক নথি নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়: ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাধারণ ও প্রাথমিক পর্যায়ের অধিকাংশ সংশোধন আবেদন এখন উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। তবে নাম পরিবর্তন, পিতা-মাতার নাম সংশোধন কিংবা জন্মতারিখ পরিবর্তনের মতো একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক তথ্য একসঙ্গে সংশোধনের জটিল ও সংবেদনশীল আবেদনগুলো সরাসরি উচ্চপর্যায়ে প্রেরণ করা হয়। সেখানে জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত ও একাডেমিক সনদসহ প্রতিটি প্রাসঙ্গিক সরকারি নথি অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। বিশেষ করে পিতার নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পিতার নিজস্ব এনআইডি কার্ড এবং পরিবারের অন্যান্য ভাই-বোনের দাপ্তরিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, কেবল একটি সাধারণ হলফনামার বা এফিডেভিটের আইনি ভিত্তির ওপর নির্ভর করে জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনো মৌলিক তথ্য সংশোধন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্পষ্ট করে বলেন, “আপনি যদি আপনার নিজের নাম কিংবা আপনার বাবার নাম পরিবর্তন করতে চান, তবে আমরা স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারি যে আপনার পরিবারের অন্য ভাই-বোনদের এনআইডি কার্ডগুলো নিয়ে আসেন। তাঁদের এনআইডি কার্ডে আপনাদের বাবার নাম অবিকল কী লেখা রয়েছে, তা আমরা মিলিয়ে দেখতে চাই।” প্রতিটি তথ্যের শতভাগ যথার্থতা ও সত্যতা প্রমাণের জন্যই মূলত এই অতিরিক্ত তথ্যগুলো তলব করা হয় বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

ইসি সচিবালয়ে প্রবেশে কড়াকড়ি: এদিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে একটি নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এখন থেকে ইসি সচিবালয় ভবন চত্বরে প্রবেশ করার পর এবং পুরো অবস্থানকালে প্রতিটি দর্শনার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁদের নিজস্ব পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড দৃশ্যমান ও ঝোলানো অবস্থায় রাখতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী নাগরিকদের বিভিন্ন অভিযোগ: অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ ভুক্তভোগী নাগরিকদের পক্ষ থেকেও নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি যশোরের কেশবপুর এলাকা থেকে এনআইডি সংশোধন করতে আসা হরিদাশ কর্মকার (ছদ্মনাম) নামের এক সেবাগ্রহীতা জানান, তিনি বিগত প্রায় ছয় মাস আগে তাঁর স্ত্রীর নাম সংশোধনের জন্য যথাযথ নিয়মে অনলাইনে আবেদন করেছেন।

প্রাথমিক প্রক্রিয়ার সময় তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, তাঁর স্ত্রীর নামে সিস্টেমে দুটি আলাদা জন্মনিবন্ধন নম্বর রয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো একটি অপ্রয়োজনীয় জন্মনিবন্ধন সম্পূর্ণ বাতিল করে সার্টিফিকেট নিয়ে আসলে তাঁর নাম সংশোধন করে দেওয়া হবে। এরপর তিনি দীর্ঘ দৌড়ঝাঁপ করে একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে যখন পুনরায় ইসিতে আসেন, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নতুন করে জানান যে, নাম সংশোধনের জন্য তাঁর স্ত্রীর ভাই ও বোনের অফিশিয়াল প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের ছাপসহ আরও বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত নথিপত্র ও দাপ্তরিক ডকুমেন্টের দাবি করা হয়, যা তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংগ্রহ করতে পারেননি এবং এ কারণে তাঁর কাজ এখনো ঝুলে আছে।

১৩ লাখের বেশি আবেদন বাতিল: নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশ থেকে এ পর্যন্ত জমা পড়া মোট ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন আবেদনের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি আবেদন সফলভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট কারণে সর্বমোট ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন সম্পূর্ণভাবে বাতিল বা খারিজ করা হয়েছে।

আবেদন বিপুল পরিমাণে বাতিলের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে সিইসি বলেন, “মূলত প্রয়োজনীয় ও সঠিক তথ্যের অভাব, বৈধ জন্মসনদের ঘাটতি এবং তথ্যের অমিলের কারণেই এই আবেদনগুলো বাতিল করা হয়েছে।” অনেকের ক্ষেত্রে একাধিক ভিন্ন জন্মসনদ, এসএসসি বা উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটের জন্মতারিখ ভিন্ন থাকায় যেকোনো একটি মাত্র ডকুমেন্টের ওপর শতভাগ নির্ভর করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া নির্বাচন কমিশনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে পরিষ্কার করে জানান যে, বাতিলের মোট এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে এত বিশাল সংখ্যক আলাদা আবেদনকারী সরাসরি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর বড় একটি কারণ হলো, একই আবেদনকারী হয়তো নিজের অজান্তেই কিংবা ভুল সংশোধনের আশায় চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত একই আবেদন পুনরায় সাবমিট করেছেন। আবার একটিমাত্র একক আবেদনে একাধিক ভিন্ন তথ্য সংশোধনের অনুরোধ করা হলে, হয়তো একটি তথ্য সংশোধনযোগ্য হলেও অন্য তথ্যগুলোর অসঙ্গতির কারণে পুরো আবেদনটিই কারিগরি ও আইনি কারণে বাতিল করতে হয়েছে।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আরও যোগ করেন যে, উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায় পর্যন্ত আবেদন বাতিল হওয়ার পরও সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা চাইলে সর্বশেষ সচিব মহোদয় বরাবর উচ্চতর আপিল করার সুযোগ পান, সেখানেও যথাযথ নথির অভাবে আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু আবেদন প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে ছয় থেকে সাতবার পর্যন্তও বাতিল হয়েছে। ফলস্বরূপ, কেবল বাতিলের এই মোট সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বা ভুক্তভোগী আবেদনকারীর সঠিক সংখ্যা কখনোই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

প্রবাসীদের নানামুখী জটিলতা ও বিশেষ উদ্যোগ: বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানামুখী সেবা দ্রুত ও সহজ করার জন্য নির্বাচন কমিশন আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যাঁদের সমস্ত कागপত্র ও দাপ্তরিক কাগজপত্র শতভাগ সঠিক রয়েছে, তাঁদের জমা দেওয়া আবেদনগুলো అత్యান্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিইসি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে প্রবাসীদের জন্য ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছি।”

তবে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে নানা জালিয়াতির বিষয় তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “অনেকেই একসময় সঠিক ও বৈধ পাসপোর্ট নিয়ে হয়তো বিদেশে যাননি, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন অসৎ দালালচক্রের মাধ্যমে অনিয়মিত উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এসব বিষয় ও ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই রকম গুরুতর রিপোর্ট আসছে যে, বেশ কিছু রোহিঙ্গা নাগরিক সুচতুরভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে সেখানে অবৈধভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।”

প্রবাসীদের দেশের ‘অর্থনৈতিক লাইফলাইন’ হিসেবে অভিহিত করে সিইসি জোরালোভাবে বলেন, “যদি কোনো প্রবাসী নাগরিকের সমস্ত দাপ্তরিক তথ্য ও কাগজপত্র সম্পূর্ণ ঠিকঠাক থাকে, তবে আমরা অবশ্যই ন্যূনতম সময়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করার সর্বাত্মক চেষ্টা করব। কারণ আমাদের প্রবাসীরা হলেন আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তি বা লাইফলাইন। আমরা তাঁদের যেকোনো সেবা যতটা সম্ভব ‘ভিআইপি মর্যাদায়’ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

ইসি সচিব আখতার আহমেদ এ বিষয়ে আরও যোগ করেন যে, অতীতে বহু প্রবাসী দেশে থাকাকালীন সাধারণ এনআইডি কার্ড তৈরি করলেও পরবর্তীতে বিদেশে যাওয়ার তাগিদে সম্পূর্ণ ভিন্ন জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি করেন, যার ফলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের তথ্যের মধ্যে ব্যাপক অমিল বা অসঙ্গতি তৈরি হয়। সাধারণত নতুন জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির সময় যদি প্রার্থীরা পূর্বের এনআইডি কার্ডের তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে তা তৈরি করতেন, তবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব হতো।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন কর্মসংস্থানমুখী দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সের কঠোর শর্ত বা বয়সসীমা থাকায় অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে বিদেশে যাওয়ার সুবিধার্থে নিজেদের বয়সসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করেন। পরবর্তীতে যখন তারা বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন বড় ধরনের আইনি বা দাপ্তরিক সমস্যায় পড়েন, তখন দেশে ফিরে নিজেদের প্রকৃত বয়স ঠিক করার জন্য বাবা কিংবা মায়ের নাম বা জন্মতারিখ পরিবর্তনের অযৌক্তিক ও জটিল আবেদন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দারস্থ হন।

কোন সংশোধন প্রক্রিয়া সহজ এবং কোনটি জটিল: নির্বাচন কমিশনের মূল লক্ষ্য ও নীতি হলো—নাগরিকেরা যেন ভোটার নিবন্ধনের প্রাথমিক ধাপেই সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য ও নির্ভুল নথিপত্র প্রদান করেন, যাতে পরবর্তীতে জীবনের কোনো পর্যায়েই অপ্রয়োজনীয়ভাবে এনআইডি সংশোধনের কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে না হয়।

সাধারণ নিয়মানুযায়ী, কেবল স্থানান্তরের কারণে আবাসিক ঠিকানা পরিবর্তন, বিবাহ বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন কিংবা আইনগত প্রক্রিয়ায় নিজ ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে তুলনামূলক সহজে ও দ্রুত সংশোধন করা সম্ভব।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মোড. সাইফুল ইসলাম বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানান যে, ব্যক্তির নিজের নাম, বাবা কিংবা মায়ের আসল পরিচয় কিংবা জন্মতারিখের মতো অত্যন্ত মৌলিক ও সংবেদনশীল তথ্যগুলো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধে প্রতিটি তথ্য ও দাপ্তরিক প্রমাণ অত্যন্ত কঠোরভাবে এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন।