ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ অভিযোগ করেছেন, ৩ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণের সময় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে একটি ‘অস্ত্র পরীক্ষাগার’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাঁর দাবি, এই অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এমন সামরিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, যা আগে কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার হয়নি।
ভেনেজুয়েলার গণমাধ্যমের বরাতে বলা হয়, ওই অভিযানে ৪৭ জন ভেনেজুয়েলান সেনা নিহত হন। পাশাপাশি মাদুরোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত ৩২ জন কিউবান সেনারও প্রাণহানি ঘটে। লোপেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেই স্বীকার করেছেন যে এমন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা আগে কারও হাতে ছিল না।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে অভিযানে একটি ‘সনিক অস্ত্র’ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন। পরে নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, অভিযানে ‘ডিসকম্বোবুলেটর’ নামের একটি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম অকার্যকর করে দেয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
অভিযানের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ না হলেও সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও এমন অস্ত্র ও কৌশল ব্যবহার করেছে, যা শত্রুপক্ষের সেনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত বা অকার্যকর করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘপাল্লার শব্দতরঙ্গ নির্গতকারী যন্ত্র, যা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে। তবে এসব যন্ত্র সাধারণত মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে, যন্ত্রপাতি বা যোগাযোগব্যবস্থা নষ্ট করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাকে ‘সনিক অস্ত্র’ বলা হচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো দীর্ঘপাল্লার ধ্বনি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। এটি উচ্চমাত্রার শব্দ দিয়ে অস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা, মাথা ঘোরা বা বমিভাব সৃষ্টি করতে পারে। তবে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা এর নেই।
মানুষকে বিভ্রান্ত করার আরেকটি পদ্ধতি হলো সক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যেখানে শব্দ নয়, বরং ত্বকে তীব্র উত্তাপের অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়। এটিও মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে, যন্ত্রের ওপর নয়।
যন্ত্রপাতি অকার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, যেখানে রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা জ্যাম করা হয়, জিপিএস বিভ্রান্ত করা হয়। এছাড়া সাইবার হামলার মাধ্যমে শিল্প ও সামরিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নষ্ট করার নজিরও রয়েছে। উচ্চক্ষমতার মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি দিয়েও ইলেকট্রনিক সার্কিট ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব। অতীতে বিদ্যুৎ গ্রিড অচল করতে গ্রাফাইট বা কার্বন ফাইবার অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘ডিসকম্বোবুলেটর’ নামে নির্দিষ্ট কোনো স্বীকৃত অস্ত্রের অস্তিত্ব জানা নেই। এটি সম্ভবত একটি রাজনৈতিক শব্দ, যা বিভিন্ন অ-ঘাতক বা অপ্রচলিত কৌশলের সমষ্টিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাস্তবে এটি সাইবার হামলা, ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার মতো পরিচিত পদ্ধতিরই সমন্বয় হতে পারে।
তাঁদের মতে, ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার কারণ নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির অস্ত্র নয়, বরং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, সাইবার আক্রমণ বা সমন্বয়হীনতার ফলও হতে পারে। সিরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলেও এমন নজির দেখা গেছে।
মানুষের ওপর যে শারীরিক উপসর্গের কথা বলা হচ্ছে, তা নতুন কোনো অস্ত্রের প্রমাণ নয়। বিস্ফোরণের চাপ, ফ্ল্যাশ-ব্যাং গ্রেনেড বা প্রচলিত বিভ্রান্তিমূলক সরঞ্জাম থেকেও এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত, মাদুরো অপহরণে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ডিসকম্বোবুলেটর’ কোনো রহস্যময় নতুন অস্ত্র নয়। বরং এটি পরিচিত সামরিক ও প্রযুক্তিগত কৌশলের সমন্বিত প্রয়োগ, যাকে রাজনৈতিক ভাষায় নতুন নামে উপস্থাপন করা হয়েছে।
















