সরকারি রাজস্ব মাত্র ১১ টাকা, অথচ কেজিতে বাড়তি আদায় ৪০০; বনবিভাগের আশ্রয়ে শুঁটকি বাণিজ্যে নৈরাজ্য
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনের দুবলার চর এখন ‘সাহেব সিন্ডিকেটের’ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই দ্বীপে শুঁটকি মাছের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী মাফিয়া চক্র, যার ফলে সাধারণ জেলেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং পর্যটকরা গুণছেন চারগুণ বেশি দাম। বনবিভাগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ‘সাহেব’ নামে পরিচিত প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগীরা মাত্র চারটি নির্দিষ্ট দোকানের মাধ্যমে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতি কেজি শুঁটকিতে সরকারের রাজস্ব মাত্র ১১.৫০ টাকা হলেও, সিন্ডিকেট চক্র লটে লইট্টা ও ছুরি শুঁটকিতে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ জেলেরা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চাইলেও, একচেটিয়া এই কারবারে পর্যটন শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি মৌসুমে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় ‘রসিদ ছাড়া শুঁটকি কেনা অপরাধ’—এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে পর্যটকদের পকেট কাটছে চারটি নির্দিষ্ট ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি।
সিন্ডিকেটের কবজায় ৪ দোকান: যেভাবে চলছে লুটপাট
সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, দুবলার চরে এবার উন্মুক্ত বিক্রয় ব্যবস্থা বন্ধ করে বনবিভাগ কেবল চারটি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিকে শুঁটকি বিক্রির অনুমতি দিয়েছে। এই দোকানগুলো হলো:
১. সাগর ট্রান্সপোর্ট
২. মেসার্স সুন্দরবন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি
৩. সুন্দরবন সাউথ জোন ট্রান্সপোর্ট
৪. মেসার্স নিউ রামপাল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি
উল্লেখ্য, এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছেন দুবলা নিউমার্কেট ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহম্মদ, যিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ব্যবহার করে নিজের মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। সাধারণ জেলেরা পর্যটকদের কাছে সরাসরি শুঁটকি বিক্রি করতে পারছেন না, ফলে পাইকারি দরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে পর্যটকরা পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাজারমূল্য বনাম সিন্ডিকেট মূল্য
জেলেদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায় এক ভয়াবহ বৈষম্য:
- টেংরা শুঁটকি: জেলেরা বিক্রি করেন ১০০-১৫০ টাকায়, সিন্ডিকেট বিক্রি করছে ৪০০ টাকায়।
- লইট্টা শুঁটকি: পাইকারি দর ৩০০-৪০০ টাকা হলেও পর্যটকদের কাছে চাওয়া হচ্ছে ৮০০-১১০০ টাকা।
- ছুরি শুঁটকি: আকারভেদে ৪০০-৯০০ টাকার শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ১২০০-১৪০০ টাকায়।
- কোরাল ও রূপচাঁদা: কেজিপ্রতি দর হাঁকা হচ্ছে ৪০০০ টাকা পর্যন্ত।
দুবলার জেলেপল্লি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিলটন রায় নিয়ন্ত্রিত বিক্রয় ব্যবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। তবে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর বক্তব্যে পাওয়া গেছে দায় এড়ানোর সুর। তিনি বলেন, “দোকানগুলো নিজেরা আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা শুধু রাজস্বের বিষয়টি দেখি।” অথচ পর্যটকদের অভিযোগ, বনবিভাগের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এমন প্রকাশ্য লুটপাট অসম্ভব।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) কোষাধ্যক্ষ সায়েম বাবুর মতে, প্রতি মৌসুমে প্রায় এক লক্ষ পর্যটক দুবলার চরে যান। পর্যটকরা এখানে এসে প্রতারিত হওয়ার ফলে সুন্দরবনের পর্যটন ব্র্যান্ডিং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নির্বাচনের পরপরই এই সিন্ডিকেট বন্ধে বনবিভাগের দপ্তরে আনুষ্ঠানিক দাবি জানানোর ঘোষণা দিয়েছে টোয়াস।
















