অতিরিক্ত বন্দির চাপে বিপর্যয়ের মুখে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কারাগার ব্যবস্থা। জায়গা সংকট মোকাবিলায় নতুন আইনে নির্দিষ্ট কিছু বন্দিকে সাজা শেষ হওয়ার আগেই মুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু হার্পারের হত্যায় দণ্ডিত দুই ব্যক্তিও এই সুবিধা পেতে পারেন—এ খবর প্রকাশের পর তীব্র জনরোষ তৈরি হয়েছে।
নতুন আইনের আওতায় নির্দিষ্ট মেয়াদের সাজাপ্রাপ্ত কিছু বন্দিকে আগের নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেক আগেই কারাগার থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এই ব্যবস্থা চলতি বছরের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
তবে সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন। ধর্ষণ, গুরুতর শিশু যৌন অপরাধ ও শিশুদের যৌন শোষণের মতো অপরাধে দণ্ডিতদের আগাম মুক্তির আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগাম মুক্তির যোগ্য বন্দির সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার থেকে কমে পাঁচ হাজারে নেমেছে।
তবে হত্যার দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একই ছাড় রাখা হয়নি। ফলে ২০১৯ সালে নিহত পুলিশ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু হার্পারের হত্যায় দণ্ডিত দুই ব্যক্তিও আগাম মুক্তির সুযোগ পেতে পারেন।
হার্পার দায়িত্ব পালনকালে একটি চুরির ঘটনায় সাড়া দিতে গিয়ে নিহত হন। পালিয়ে যাওয়ার সময় তিন কিশোরের ব্যবহৃত একটি গাড়ির সঙ্গে তাঁর পা আটকে যায়। গাড়িটি তাঁকে প্রায় এক দশমিক আট কিলোমিটার টেনে নিয়ে গেলে গুরুতর আহত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় অ্যালবার্ট বোয়ার্স ও জেসি কোলকে অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে তেরো বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। প্রচলিত নিয়মে তাঁদের সাজা শেষ হওয়ার আগে মুক্তির সুযোগ সীমিত ছিল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় তাঁরা আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের দিকে আগাম মুক্তির যোগ্য হতে পারেন।
তৃতীয় দণ্ডিত ব্যক্তি হেনরি লংয়ের সাজা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তাঁর মুক্তির বিষয়টি আলাদা পর্যালোচনার আওতায় পড়বে।
হার্পারের স্ত্রী লিসি হার্পার দুই দণ্ডিত ব্যক্তির আগাম মুক্তি ঠেকানোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁর পরিবারের পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তারাও সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন। এরই মধ্যে প্রায় নয় লাখ মানুষ আগাম মুক্তি ঠেকাতে একটি আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। বুধবার পঞ্চাশজন পুলিশ প্রধানও প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে সব ধরনের আইনগত পথ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হার্পারের পরিবারের যন্ত্রণা তিনি বুঝতে পারছেন এবং গুরুতর অপরাধীদের আগাম মুক্তি ঠেকানোর উপায় খুঁজছেন। তবে কীভাবে আইনগতভাবে তা করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কারাগারে কেন এত চাপ
যুক্তরাজ্যের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত বন্দির চাপে রয়েছে। গত তিন দশকে দেশটিতে কারাবন্দির সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যদিও অপরাধের হার কমেছে। দীর্ঘতর সাজা এবং মুক্তির পর পুনরায় কারাগারে পাঠানোর সংখ্যা বাড়ায় বন্দির চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে পুরুষদের কারাগারগুলো প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের অধিকাংশ কারাগারেই ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি বন্দি রয়েছে।
নতুন কারাগার নির্মাণ করেও দ্রুত সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। একটি নতুন কারাগার নির্মাণ ও চালু করতে গড়ে প্রায় সাত বছর সময় লাগতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত কারা কর্মীর দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি।
গত কয়েক বছরে গুরুতর অপরাধের জন্য সাজা বাড়ানোর বিভিন্ন সিদ্ধান্তও কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়িয়েছে। ফলে নতুন বন্দিদের জায়গা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি হয়নি।
কারাগার সংস্কার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দীর্ঘদিন ধরে কারাদণ্ডের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। কারাগারে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বন্দিদের পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে। অনেক বন্দিকে দিনের বড় অংশ ঘনবসতিপূর্ণ কক্ষে কাটাতে হচ্ছে, যা আত্মক্ষতি, সহিংসতা ও পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আগাম মুক্তির নতুন ব্যবস্থা
নতুন ব্যবস্থায় অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত কিছু বন্দি তাঁদের সাজা শেষ হওয়ার অনেক আগেই কারাগার থেকে বের হতে পারবেন। যারা সাধারণত সাজা মেয়াদের চল্লিশ বা পঞ্চাশ শতাংশ কারাগারে কাটানোর কথা, তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ সাজা শেষ হওয়ার পর মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
আরেক শ্রেণির বন্দি, যারা সাধারণত সাজা মেয়াদের দুই-তৃতীয়াংশ কারাগারে কাটাতেন, তাঁদের অর্ধেক সাজা শেষ হওয়ার পর মুক্তি দেওয়া হবে।
তবে আগাম মুক্তি মানে সাজা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। মুক্তিপ্রাপ্তদের বাকি সাজা সমাজে থেকে নির্দিষ্ট শর্তের অধীনে কাটাতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে তাঁদের আবার কারাগারে পাঠানো যেতে পারে।
সরকারের দাবি, এই ব্যবস্থা কারাগারের ওপর চাপ কমাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ শরৎকালেই কারাগারের জায়গা প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আগাম মুক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কারাগারে পাঠানোর প্রবণতা কমানো, জামিনের বিকল্প ব্যবস্থা বাড়ানো, সাজা নির্ধারণে ভারসাম্য আনা এবং সমাজে পুনর্বাসনের কার্যক্রম শক্তিশালী করাই স্থায়ী সমাধানের পথ হতে পারে।
অ্যান্ড্রু হার্পারের হত্যাকারীদের সম্ভাব্য আগাম মুক্তিকে ঘিরে তৈরি বিতর্ক তাই শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের কারাগার সংকট, সাজানীতি এবং অপরাধ দমনের কাঠামোগত দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।















