বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার বেসরকারি কোম্পানির জন্য দ্রুত উন্মুক্ত করার অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে শ্রমিক সংগঠন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ সংকট এবং বেসরকারি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে মাত্র চার দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়ার পর বিতর্ক তীব্র হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের অনুমতি পেতে পারে।
নীতিগত উদ্যোগের কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে আকস্মিকভাবে সরিয়ে দেওয়াও প্রশ্ন তৈরি করেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, জ্বালানি আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে মতপার্থক্যের পর এই পরিবর্তন ঘটে। তবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বদলির সঙ্গে নতুন জ্বালানি নীতির কোনো সম্পর্কের কথা জানায়নি।
আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, তারা বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, ১ লাখ ৫০ হাজার টন পেট্রল এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে চায়। এসব পরিমাণ দেশের পরিশোধিত জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ হতে পারে।
বসুন্ধরা গ্রুপের দাবি, বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো এটিকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন জানিয়েছে, সরকার উদ্যোগ থেকে সরে না এলে দেশব্যাপী আন্দোলন করা হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত আমদানি উদারীকরণের ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্য কারসাজির সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বাংলাদেশের ভোজ্যতেল, চিনি ও এলপিজি বাজারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এসব খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমিত সংখ্যক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের কারণে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ধরনের সিন্ডিকেট আচরণ জ্বালানি খাতে হলে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি গণপরিবহন, কৃষির সেচ, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় সাময়িক সরবরাহ সংকটও খাদ্যের দাম ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা চার দিনের মধ্যে এত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা তৈরির সময়সীমাকেও অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার আইন, স্বচ্ছ লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছাড়া কৌশলগত এই বাজার বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
















