লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৩০ শতাংশ চলাচল করে। হুথি হামলা, জলদস্যুতা, অবৈধ পাচার ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানো জাহাজের তৎপরতায় অঞ্চলটির নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লেও সামুদ্রিক সম্পদ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে আফ্রিকার সামনে।
লোহিত সাগর আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। ভারত মহাসাগর থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত এই সমুদ্রপথ এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে।
বিশ্বের মোট বাণিজ্যের আনুমানিক ১২ শতাংশ লোহিত সাগর দিয়ে পরিচালিত হয়। কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের অংশ প্রায় ৩০ শতাংশ। ফলে এখানে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু উপকূলীয় দেশগুলোতেই নয়, বিশ্ব বাণিজ্যেও পড়ে।
লোহিত সাগর ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে আরও জটিল হয়েছে। হুথিদের হামলা, জলদস্যুতা, অস্ত্র ও মাদক পাচার, অবৈধ মাছ ধরা এবং সমুদ্রপথে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অঞ্চলটির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহৃত গোপন বা ছায়া নৌবহর নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সমুদ্রের তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সমুদ্রতলের তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা নাশকতার ঘটনা বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
ভৌগোলিকভাবে লোহিত সাগরের পূর্ব উপকূলে রয়েছে সৌদি আরব ও ইয়েমেন। পশ্চিম উপকূলে রয়েছে মিসর, সুদান, ইরিত্রিয়া ও জিবুতি। উত্তরে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সুয়েজ উপসাগর ও আকাবা উপসাগর। আকাবা উপসাগরের সঙ্গে মিসর, ইসরায়েল, জর্ডান ও সৌদি আরবের উপকূল যুক্ত।
এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে লোহিত সাগর ঘিরে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো সমুদ্রপথ, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও সামুদ্রিক সম্পদের ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি সৌদি আরব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তার জন্য একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এতে সৌদি আরব, জর্ডান, ইয়েমেন, মিসর, সুদান, জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়া রয়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নৌপথ, বাণিজ্যিক ও জ্বালানি পরিবহন এবং সম্মিলিত সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করাই এই জোটের লক্ষ্য। অঞ্চলটিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সময়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা সংকটের কারণে বিশ্বের অনেক জাহাজ কোম্পানি লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং ইউরোপ ও আফ্রিকার বাজারে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
আফ্রিকার জন্য নতুন এই জোটের গুরুত্ব অনেক বেশি। মিসর, জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়া গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথের কাছে অবস্থিত। সুদানের দীর্ঘ উপকূলও উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে।
জিবুতি, ইরিত্রিয়া ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই প্রণালিতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে আফ্রিকার আমদানি-রপ্তানি, জ্বালানি সরবরাহ ও খাদ্য নিরাপত্তা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মিসরের জন্য সুয়েজ খাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস এই খাল। নিরাপত্তা সংকটের কারণে জাহাজ চলাচল কমে গেলে সুয়েজ খালের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন উদ্যোগ আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য জলদস্যুতা, অস্ত্র পাচার, অবৈধ মাছ ধরা ও মানব পাচারের মতো অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, আফ্রিকা এই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারবে। লোহিত সাগরের বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আফ্রিকার দেশগুলো অনেক সময় অঞ্চলটির কৌশলগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকার পরিবর্তে দর্শকের ভূমিকায় থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকাকে নিজেদের সামুদ্রিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করতে হবে। নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি বন্দর, জ্বালানি, পর্যটন, সামুদ্রিক সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণে যৌথ বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে লোহিত সাগরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, চালকবিহীন আকাশযান ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উপকূলীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও বাড়ছে।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো লোহিত সাগরের উপকূলকে পর্যটন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা করছে। ফলে অঞ্চলটি আগামী দিনে নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বড় অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রও হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট, উপসাগরীয় দেশ এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সহযোগিতার ওপর। নিরাপত্তা সংকট অব্যাহত থাকলে অঞ্চলটির বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে স্থিতিশীলতা ফিরলে লোহিত সাগর আফ্রিকার জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।















