ইরানের বর্তমান বৈরী বক্তব্য ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান দেখে দেশটির সঙ্গে সমঝোতা অসম্ভব মনে হলেও একটি মতামতধর্মী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের প্রধান লক্ষ্য আদর্শিক অবস্থান ধরে রাখা নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার টিকে থাকা নিশ্চিত করা। সেই কারণে প্রয়োজন হলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গেও সমঝোতায় যেতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সংবিধান ও সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশটির নীতিনির্ধারণ কেবল আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয় না। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নীতির প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন দেখা যায় সংবিধানের একশ বারো নম্বর ধারায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য ধর্মীয় বিধানের ক্ষেত্রেও বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতা, বিদেশি আধিপত্যের প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থনকে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে বিশ্লেষকের মতে, এই বিরোধিতা সব ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।
ইরানের আঞ্চলিক কৌশলে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনকে নিজেদের নিরাপত্তা, প্রভাব বিস্তার এবং কৌশলগত সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে অন্য দেশের ওপর আধিপত্যের বিরোধিতা করার যে নীতি ইরান নিজস্ব ক্ষেত্রে তুলে ধরে, আঞ্চলিক রাজনীতিতে তার প্রয়োগ অনেক সময় ভিন্ন হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই আচরণকে কেবল ভণ্ডামি হিসেবে দেখার পরিবর্তে রাষ্ট্রের টিকে থাকার স্বাভাবিক কৌশল হিসেবেও দেখা যায়। রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষা করা। ইরানের ক্ষেত্রেও আদর্শিক অবস্থানের ওপরে রাষ্ট্রব্যবস্থার টিকে থাকার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতার কারণে ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সমঝোতার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশটির যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার নীতির অধীন বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের ইতিহাসেও এমন উদাহরণ রয়েছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন, যদিও তিনি প্রকাশ্যে সেই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত কঠিন বলে বর্ণনা করেছিলেন। একই সময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ও অস্ত্রসংক্রান্ত লেনদেনেও জড়িয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির আলোচনাতেও ইরানি ও মার্কিন কূটনীতিকরা একই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সহযোগিতা করেছিলেন। এসব ঘটনা দেখায়, ইরানের ঘোষিত নীতিতে কঠোর সীমারেখা থাকলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রয়োজনে সেই সীমারেখা অতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা করা হয়। বিশ্লেষকের মতে, এটি ইরানের প্রচলিত আদর্শিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম।
এরপর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এতে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের জব্দ করা অর্থে প্রবেশাধিকার এবং পুনর্গঠন সহায়তার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন সর্বোচ্চ নেতাও লিখিতভাবে ওই সমঝোতার অনুমোদন দেন, যদিও তিনি কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
পরে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে বিশ্লেষকের মতে, সমঝোতাটির অস্তিত্বই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অস্তিত্বের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতায় যেতে পারে—এটি তার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
ইরানের নেতৃত্ব কীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে এমন সমঝোতা করতে পারে, তার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে বিশ্লেষণে। সেখানে বলা হয়েছে, সমঝোতাকে আত্মসমর্পণ হিসেবে না দেখিয়ে কৌশলগত নমনীয়তা বা দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি কৌশলগত নমনীয়তার ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। এর অর্থ হলো প্রয়োজন অনুযায়ী সাময়িকভাবে পিছিয়ে যাওয়া, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থেকে সরে না যাওয়া। ফলে কোনো আপসকে আদর্শ পরিত্যাগ হিসেবে না দেখিয়ে রাষ্ট্রের টিকে থাকার কৌশল হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমঝোতা হলেও তা দেশটিকে গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে সাধারণ ইরানির অর্থনৈতিক দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার না হলে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের কাঠামো আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ইরান ইতোমধ্যে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মতো কঠোর পদক্ষেপ বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দমনমূলক প্রতিষ্ঠান কেবল নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি হয়নি। তাই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমননীতি বন্ধ হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকের মতে, ইরানের সামনে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুলে যেতে পারে, যদিও এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের প্রতি বন্ধুত্ব বা আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তন নয়। বরং যুদ্ধের ঝুঁকি কমানো এবং অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখাই সেই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে।
অর্থাৎ ইরানের বর্তমান বৈরী অবস্থান যতই কঠোর হোক, রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রয়োজন হলে সেই অবস্থানে কৌশলগত পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, ইরানের পররাষ্ট্রনীতিকে শুধু আদর্শ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব চিত্রের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা এবং শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তাই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।















