বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ক্রমাগত ভাঙন দেখা দিয়েছে। আসন ভাগাভাগি, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান এবং জামায়াতের আধিপত্য নিয়ে অসন্তোষের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল জোটের কার্যক্রম থেকে সরে গেছে বা দূরত্ব তৈরি করেছে। এর ফলে বৃহত্তর ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে এক প্ল্যাটফর্মে রাখার জামায়াতের প্রচেষ্টা দুর্বল হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে আটটি দল নিয়ে যাত্রা শুরু করে। পরে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও আমার বাংলাদেশ পার্টি যুক্ত হলে জোটটি ১১ দলে পরিণত হয়। তবে নির্বাচনের আগেই ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধের কারণে জোট ছাড়ে এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়।
নির্বাচনের পর জোটের ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন জোটের কার্যক্রম থেকে দূরত্ব তৈরি করে এবং তাদের নাম ভবিষ্যৎ কর্মসূচিতে ব্যবহার না করার অনুরোধ জানায়। ২৫ জুলাই খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ দলীয় ঐক্যের কার্যক্রম ও কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির মতে, ঐক্যটি মূলত নির্বাচনী সমঝোতা ছিল এবং জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে এর উদ্দেশ্যও শেষ হয়েছে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জোট এখনো ঐক্যবদ্ধ এবং কোনো কোনো দল সব কর্মসূচিতে অংশ না নিলেই জোট ভেঙে গেছে বলা যায় না।
জোটের ভেতরের অসন্তোষের আরেকটি দিক হলো নির্বাচনের পর জামায়াতের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়া। খেলাফত মজলিসের এক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি আসন পেলেও জোটের অন্য কয়েকটি দল কোনো আসন পায়নি। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের পর জোটের মূল্যায়ন না করেই জামায়াত ১১টি সিটি করপোরেশনে নিজস্ব মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে, ফলে শরিক দলগুলো কার্যত দর্শকে পরিণত হয়েছে।
একই সময়ে হেফাজতে ইসলাম কওমি ধারার সাতটি ইসলামপন্থী দলকে নিয়ে পৃথক ঐক্যের উদ্যোগ জোরদার করেছে। ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে সাতটি কওমি ঘরানার দল ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়। এসব দলের মধ্যে কয়েকটি আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অংশ ছিল।
জামায়াত ও হেফাজতের মধ্যে আদর্শগত ও রাজনৈতিক বিরোধও নতুন নয়। ৫ ফেব্রুয়ারি হেফাজতের আমির বাবুনগরী জামায়াতকে ভোট দেওয়া ইসলামসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং জামায়াতকে ইসলামবিরোধী শক্তি হিসেবে আক্রমণ করেছিলেন। ফলে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে জামায়াতের পাশাপাশি হেফাজতও একটি পৃথক প্রভাবকেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে।
এদিকে ২ আগস্ট ঢাকায় হিজবুত তাওহিদ হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে। সংগঠনটির অভিযোগ, নোয়াখালীতে হেফাজতের একটি সমাবেশে তাদের বিরুদ্ধে হুমকি, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা দেখাচ্ছে যে ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু নির্বাচনী জোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; ধর্মীয় বৈধতা ও প্রভাব বিস্তার নিয়েও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে সংঘাত বাড়ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব বিভাজনের ফলে জামায়াতের বৃহত্তর ইসলামপন্থী জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি দুর্বল হচ্ছে। জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক ও নির্বাচনী কাঠামোর বিপরীতে হেফাজতে ইসলাম কওমি মাদ্রাসা ও আলেমদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নির্বাচনের বাইরেও ধর্মীয় জনমত ও সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।
ফলে ভবিষ্যতের স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বদলে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতি বর্তমানে একটি একক নেতৃত্বাধীন ব্লকের পরিবর্তে জামায়াত, হেফাজত ও অন্যান্য সংগঠনকে ঘিরে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবকেন্দ্রে বিভক্ত হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।
















