সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাভাবিক গতিতে এগোলে আগামী ডিসেম্বর মাস শুরু হওয়ার আগেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে সফলভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, মেগা প্রকল্পটির নিয়মিত পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বর্তমানে ২০ শতাংশ তাপীয় ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। আগামী পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সব জটিল ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে মূল টারবাইন ঘুরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট-২০২৬’ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের সদুত্তর দিতে গিয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক কার্যক্রম বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ‘সি-স্টেজ’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই জটিল ধাপে সংশ্লিষ্ট স্বাধীন পরমাণু নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ছাড়পত্র নিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্তর থেকে পরবর্তী স্তরে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হচ্ছে। আজকের দিন পর্যন্ত কেন্দ্রটি সফলভাবে ২০ শতাংশ তাপীয় ক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এই সক্ষমতার মাত্রা যখন পর্যায়ক্রমে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছাবে, তখন সেখান থেকে উৎপাদিত শক্তিশালী বাষ্পকে কাজে লাগিয়ে মূল টারবাইন ঘোরানো হবে। আর টারবাইনের ঘূর্ণনের মাধ্যমে জেনারেটর চালু করা মাত্রই কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়ে যাবে।
তবে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার পূর্বে আরও বেশকিছু কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিখুঁতভাবে শেষ করতে হবে বলে উল্লেখ করেন ফকির মাহবুব আনাম। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। ফলে কোনো একটি পরীক্ষায় আশানুরূপ বা সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া না গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি বা কলকব্জা পুনরায় খুলে পরীক্ষা করা হবে এবং মেরামতের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে একবারের জায়গায় দুই, তিন কিংবা চারবার পর্যন্ত একই পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া পুনর্ব্যক্ত করা হবে। শতভাগ নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে কোনো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে না।
মন্ত্রী আরও আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, আগামী পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু যদি স্বাভাবিক ও মসৃণভাবে এগোতে থাকে, তবে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই বিষয়ে আগাম কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা সময়সীমা তিনি বেঁধে দিতে চান না। কারণ, পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর জটিল প্রক্রিয়ায় অনেক সূক্ষ্ম প্রযুক্তিগত পরীক্ষা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা থাকে। আর এসব জটিল পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করতে কিছুটা যৌক্তিক সময়ের প্রয়োজন হয়।
প্রকল্পের সাম্প্রতিক অগ্রগতির উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী প্রকাশ করেন যে, প্ল্যান্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ‘ভিভিআর ভালভ’ নিয়ে প্রকৌশলীদের টানা প্রায় দুই মাস কাজ করতে হয়েছে এবং দীর্ঘ চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত সেই কারিগরি সমস্যাটির নিখুঁত সমাধান এসেছে। রাশিয়ার মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রোসাটম’-এর সঙ্গে চমৎকার সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি স্মরণ করেন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মূল বিজ্ঞানী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালকসহ মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত বাংলাদেশি ও রাশিয়ান বিশেষজ্ঞদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটির শুরুর দিকে প্রায় ৪৯ জন শীর্ষ রাশিয়ান বিজ্ঞানী এ কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত ও কঠোর পরিশ্রমে প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিকভাবে প্রথম ধাপে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এরপর প্রযুক্তিগত পরিস্থিতি বুঝে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্রা আরও বাড়ানো হবে। প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই এই উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটেরও বেশি করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত উৎপাদন কত দ্রুত বাড়ানো হবে, তা সম্পূর্ণভাবে মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক কর্মরত বিজ্ঞানী ও পরমাণু বিশেষজ্ঞদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।
পরিশেষে মন্ত্রী আবারও নিশ্চিত করে বলেন, সবকিছু যদি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে থাকে, তবে সর্বনিম্ন্ন সময়ের মধ্যে রূপপুর থেকে দেশের জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে কাজের এই গতি ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী ডিসেম্বর মাস আসার আগেই দেশবাসী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা পেতে শুরু করবে।






















