অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আবারো জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। এবার কোনো সাধারণ ইস্যু নয়, বরং ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জনে তাঁর একক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী সত্য-মিথ্যার বিতর্ক নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র সমালোচনা। সম্প্রতি (১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, নিরাপত্তা ও অবমাননার দোহাই দিয়ে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে আসিফ নজরুলের একক সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তীতে তিনি নিজেও বিষয়টি স্বীকার করে নেন। অথচ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রাক্কালে তিনি দাবি করেছিলেন, খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল বিসিবি ও খেলোয়াড়দের যৌথ মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এই অসত্য ভাষণ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে গভীর হতাশা ও বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা তৈরি হয়েছে।
খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার অজুহাত দেওয়া হলেও বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক কোনো মেগা ইভেন্টে আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতের সার্বিক নিরাপত্তা না দেওয়ার সুযোগ ছিল না; কারণ খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দিনশেষে ভারত নিজেই বড় ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ত। মূলত ক্ষমতা বজায় রাখতে বা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে ভারত-বিদ্বেষকে উসকে দিয়ে নিজেকে ‘জাতীয়তাবাদী’ প্রমাণ করার অপচেষ্টা চালান তিনি। বিগত সরকারের সময়েও দেখা গেছে—নিজেদের অজনপ্রিয়তা ঢাকতে সস্তা আবেগ তৈরি বা অন্য দেশকে কটাক্ষ করে জনদৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রবণতা ছিল। আসিফ নজরুলের এই একক ও স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত দেশের সার্বভৌম জাতীয় স্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীগত বা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
এই একক সিদ্ধান্ত ও মিথ্যাচারের ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেট ও অর্থনীতি বড় ধরনের অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রথমত, একটি বিশ্বকাপের সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, জাতীয় পতাকা, জার্সি ও টুপি বিক্রিসহ রেস্তোরাঁ ও খাদ্য সরবরাহের যে প্রান্তিক অর্থনৈতিক উৎসব জড়িয়ে থাকে, তা থেকে দেশ বঞ্চিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে দেশের ক্রিকেটের ওপর। যেসব খেলোয়াড় সে সময়ে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন, তারা আন্তর্জাতিক সম্মান, প্রাইজমানি এবং বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ ও আর্থিক লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী চুক্তি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের যে বিশাল সুযোগ তাদের সামনে ছিল, তা এক ধাক্কায় শেষ হয়ে গেছে।
ক্রিকেট বিশ্বের উদীয়মান কোনো দল রাতারাতি পরাশক্তিতে পরিণত হয় না; এর জন্য প্রতিকূল ও শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশেও নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। ভারতে খেলতে গেলে খেলোয়াড়দের যে মনস্তাত্ত্বিক ও পেশাদার অভিজ্ঞতা অর্জিত হতো, তা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হলো। সর্বোপরি, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, জনগণের কাছে দায়বদ্ধতাহীন অনির্বাচিত শাসকেরা নিজেদের সামান্য স্বার্থ হাসিলে জাতীয় পর্যায়ের সংবেদনশীল যেকোনো অর্জনকে বলি দিতে দ্বিধা করে না—যে ক্ষতির মাশুল বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে গুনে যেতে হতে পারে।
























