Dhaka ০১:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের শঙ্কা

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:০৭:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • ৪ বার দেখা হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক সম্পদ ও বিমান বহরকে লক্ষ্য করে ইরানি সামরিক বাহিনী তাদের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছিল। আর তারই কড়া জবাব হিসেবে এই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ এবং সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমিত আকারের হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন প্রশাসন।

তবে এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এবং চলমান সংঘাত নতুন করে এক মহাবিপজ্জনক পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এই চাঞ্চল্যকর হামলার ঘটনা ঘটল। ইরানের সরকারি গণমাধ্যমের পরিবেশিত সংবাদ অনুযায়ী, কৌশলগত হরমুজ প্রণালির অন্তর্ভুক্ত কেশম দ্বীপ, হেঙ্গাম দ্বীপ এবং সংলগ্ন মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাস এলাকায় একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি ও এপির যৌথ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোর ওপর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তাক করে থাকা ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোই ছিল এই হামলার মূল টার্গেট। তবে এই সামরিক অভিযানের ফলে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পরপরই ইরানে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ সামরিক হামলা চালানোর কথা বারবার ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন। এর মাঝেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবিলম্বে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার জন্য তীব্র চাপ ও অনুরোধ জানিয়েছেন বলে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে উদ্ভূত এই ভয়াবহ যুদ্ধের বিস্তার ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা রোধ করার জন্য বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতাও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা। ওয়াশিংটনকে নতুন করে কোনো পূর্ণমাত্রার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে না জড়ানোর জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু আঞ্চলিক মিত্র দেশ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সোমবার এক বক্তব্যে জানান যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তিনি স্বয়ং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই তেহরানের সঙ্গে একটি সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর ব্যাপারে এখনো বেশ আশাবাদী।

এপির তথ্য অনুযায়ী, এর আগে সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি ভূখণ্ডে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর অবাধ যাতায়াত এবং রপ্তানি সম্পূর্ণরূপে বাধাগ্রস্ত করতে দেশটির জলসীমার ঠিক পাশেই এখনো হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও নৌ কমান্ডো মোতায়েন রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য অভিমুখে মার্কিন প্রশাসনের আরেকটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ও অতিরিক্ত আরও কয়েক হাজার সেনা সদস্যের একটি বিশাল বহর বর্তমানে যাত্রাপথে রয়েছে।

অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন প্রশাসন যদি তাদের পূর্বশর্তগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়, তবেই কেবল তারা হরমুজ প্রণালির নৌপথ উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে সংলাপে বসার কথা বিবেচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের বেঁধে দেওয়া প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল বিক্রির ওপর আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি তাঁর অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, আমেরিকা যতক্ষণ পর্যন্ত তেহরানের এই যৌক্তিক শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে না নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। পাশাপাশি ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক ও জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বর্তমান এই আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়ানোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব এখন মার্কিন প্রশাসনের হাতেই ন্যস্ত। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাদের দাবির বিপরীতে সুনির্দিষ্ট কী জবাব এসেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেননি। একই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রে জানা যায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যকার সাম্প্রতিক টেলিফোন ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানে নতুন দফায় সামরিক আঘাত হানার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে এই চরম উত্তেজনার মাঝেও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা এমন একটি কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামো তৈরির জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি সামরিক তৎপরতা ও হামলা বন্ধ করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংকট নিরসনে চলতি সপ্তাহেই আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ইতিমধ্যে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় মুহূর্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র দূরে সরিয়ে অবিলম্বে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে বসে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। আঞ্চলিক যুদ্ধ যাতে পুরো বিশ্বে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য সামরিক উত্তেজনা কোনোভাবেই আর না বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, বিশ্বের জ্বালানি তেল বাণিজ্যের মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি হলো অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল একটি সামুদ্রিক রুট, যে পথ দিয়ে শান্তিকালীন সময়েও বিশ্বজুড়ে মোট উৎপাদিত তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলস্বরূপ, এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে চলমান অস্থিরতা ও উত্তেজনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিগত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মারাত্মক চাপে ফেলে দিয়েছে এবং এর নেতিবাচক আঘাতে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই সর্বশেষ হামলার পরেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার দরজা বা সমঝোতার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। তবে একদিকে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি এবং অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক সমঝোতার মরিয়া চেষ্টা—এই দুই বিপরীতমুখী জটিল পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে পুরো হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ চিত্র চরম অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে।

জনপ্রিয়

পোশাক খাতের শ্রমিক আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতার প্রমাণ মিলল

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় সংঘাতের শঙ্কা

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:০৭:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক সম্পদ ও বিমান বহরকে লক্ষ্য করে ইরানি সামরিক বাহিনী তাদের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করছিল। আর তারই কড়া জবাব হিসেবে এই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ এবং সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমিত আকারের হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন প্রশাসন।

তবে এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এবং চলমান সংঘাত নতুন করে এক মহাবিপজ্জনক পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এই চাঞ্চল্যকর হামলার ঘটনা ঘটল। ইরানের সরকারি গণমাধ্যমের পরিবেশিত সংবাদ অনুযায়ী, কৌশলগত হরমুজ প্রণালির অন্তর্ভুক্ত কেশম দ্বীপ, হেঙ্গাম দ্বীপ এবং সংলগ্ন মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাস এলাকায় একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা গেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি ও এপির যৌথ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোর ওপর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তাক করে থাকা ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোই ছিল এই হামলার মূল টার্গেট। তবে এই সামরিক অভিযানের ফলে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পরপরই ইরানে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ সামরিক হামলা চালানোর কথা বারবার ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন। এর মাঝেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবিলম্বে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার জন্য তীব্র চাপ ও অনুরোধ জানিয়েছেন বলে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে উদ্ভূত এই ভয়াবহ যুদ্ধের বিস্তার ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা রোধ করার জন্য বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতাও সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা। ওয়াশিংটনকে নতুন করে কোনো পূর্ণমাত্রার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে না জড়ানোর জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু আঞ্চলিক মিত্র দেশ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সোমবার এক বক্তব্যে জানান যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তিনি স্বয়ং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই তেহরানের সঙ্গে একটি সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর ব্যাপারে এখনো বেশ আশাবাদী।

এপির তথ্য অনুযায়ী, এর আগে সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি ভূখণ্ডে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর অবাধ যাতায়াত এবং রপ্তানি সম্পূর্ণরূপে বাধাগ্রস্ত করতে দেশটির জলসীমার ঠিক পাশেই এখনো হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও নৌ কমান্ডো মোতায়েন রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য অভিমুখে মার্কিন প্রশাসনের আরেকটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ও অতিরিক্ত আরও কয়েক হাজার সেনা সদস্যের একটি বিশাল বহর বর্তমানে যাত্রাপথে রয়েছে।

অন্যদিকে তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন প্রশাসন যদি তাদের পূর্বশর্তগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়, তবেই কেবল তারা হরমুজ প্রণালির নৌপথ উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে সংলাপে বসার কথা বিবেচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের বেঁধে দেওয়া প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল বিক্রির ওপর আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি তাঁর অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, আমেরিকা যতক্ষণ পর্যন্ত তেহরানের এই যৌক্তিক শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে না নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। পাশাপাশি ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক ও জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বর্তমান এই আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়ানোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব এখন মার্কিন প্রশাসনের হাতেই ন্যস্ত। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাদের দাবির বিপরীতে সুনির্দিষ্ট কী জবাব এসেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেননি। একই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্ক ও প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রে জানা যায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যকার সাম্প্রতিক টেলিফোন ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানে নতুন দফায় সামরিক আঘাত হানার বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে এই চরম উত্তেজনার মাঝেও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা এমন একটি কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামো তৈরির জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি সামরিক তৎপরতা ও হামলা বন্ধ করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই সংকট নিরসনে চলতি সপ্তাহেই আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ইতিমধ্যে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় মুহূর্তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র দূরে সরিয়ে অবিলম্বে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে বসে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। আঞ্চলিক যুদ্ধ যাতে পুরো বিশ্বে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য সামরিক উত্তেজনা কোনোভাবেই আর না বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, বিশ্বের জ্বালানি তেল বাণিজ্যের মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি হলো অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল একটি সামুদ্রিক রুট, যে পথ দিয়ে শান্তিকালীন সময়েও বিশ্বজুড়ে মোট উৎপাদিত তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়ে থাকে। ফলস্বরূপ, এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে চলমান অস্থিরতা ও উত্তেজনা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিগত আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ভূরাজনৈতিক সংঘাত ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে মারাত্মক চাপে ফেলে দিয়েছে এবং এর নেতিবাচক আঘাতে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই সর্বশেষ হামলার পরেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার দরজা বা সমঝোতার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। তবে একদিকে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি এবং অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক সমঝোতার মরিয়া চেষ্টা—এই দুই বিপরীতমুখী জটিল পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে পুরো হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ চিত্র চরম অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে।