যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে আটক থাকা আফগান অভিবাসীদের একটি বৃহৎ অংশকে পুনরায় আফগানিস্তানে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বহিষ্কারের তালিকায় থাকা এসব আফগানদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং অতীতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সরাসরি নানাভাবে সহায়তা করা পরিবারের একাধিক সদস্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে ফিরে গেলে এসব ব্যক্তি চরম নির্যাতন, নিপীড়ন ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার মুখোমুখি হতে পারেন—এমন প্রবল আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিশ্বখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এ ৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে বর্তমানে আটক রাখা আফগানদের একটি বড় দলকে প্রাথমিক ধাপে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে পাঠাবার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান থেকে তাদের পর্যায়ক্রমে নিজ দেশ আফগানিস্তানে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট ছিল। এক দায়িত্বশীল মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি নিশ্চিত করেছে যে, এই প্রক্রিয়ায় অন্তত ১৫০ জনেরও বেশি আফগান নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এটি বাস্তবায়ন হলে তা হতো আফগানদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বড় একক বহিষ্কার অভিযান।
প্রতিবেদনে আরও বিস্তারিত তুলে ধরে বলা হয়, আটক হওয়া এসব অভিবাসীদের মধ্যে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের নিকটাত্মীয়রা একসময় আফগানিস্তানে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলেন। তাদের ক্ষেত্রে তালেবান গোষ্ঠীর সরাসরি প্রতিশোধ ও হামলার চরম ঝুঁকি রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অভিবাসনবিষয়ক আইনজীবী ও বৈশ্বিক মানবাধিকারকর্মীরা। এমনকি এর পূর্বে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের অন্য একটি প্রতিবেদনে বহিষ্কারের তালিকায় অন্তটল অন্তত একজন সমকামী ব্যক্তির উপস্থিতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এদিকে, পরিকল্পিত এই বহিস্কার অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার দাবিতে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসের সর্বমোট ৬৬ জন আইনপ্রণেতা। গত ২ নভেম্বর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিনকে পাঠানো একটি যৌথ চিঠিতে তাঁরা উল্লেখ করেন, যদি এই আফগানদের জোর করে তালেবানের হাতে ফেরত দেওয়া হয়, তবে তারা অমানুষিক নির্যাতন, দমন-পীড়ন এবং এমনকি প্রাণঘাতী হামলার মুখোমুখি হতে পারেন। আইনপ্রণেতাদের মতে, মার্কিন বাহিনীকে নানাভাবে সহায়তা প্রদান করা আফগান নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ওয়াশিংটনের জন্য একটি অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব।
অন্যদিকে, উদ্ভুত এই বহিস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান প্রশাসনও। আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি মুখপাত্র আবদুল কাহার বালখি জানান, তৃতীয় কোনো মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে নিজ দেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর মার্কিন উদ্যোগকে তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। সেই সাথে অন্য কোনো দেশের নাগরিকদের ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ নিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের মধ্যে দর-কষাকষি বা মধ্যস্থতা করা একেবারেই অনুচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে আইনি প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের এই বহিষ্কার প্রক্রিয়ায় আপাতত একটি সাময়িক আইনি বাধা তৈরি হয়েছে। গত ৩ নভেম্বর নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতের সম্মানিত বিচারক ভ্যালেরি ক্যাপ্রোনি ট্রাম্প প্রশাসনকে আগামী শনিবার পর্যন্ত যেকোনো আফগান নাগরিককে পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তানে বহিষ্কার করার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। আদালতে শুনানিকালে সরকারি কৌঁসুলিরা স্বীকার করেন যে, চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত আফগানদের বহিস্কার করার লক্ষ্যে কোনো বিশেষ চার্টার্ড বা নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমান ফ্লাইট নির্ধারিত নেই। বিচারকের আদালতের নির্দেশে সরকারকে নিজেদের দেওয়া এই বক্তব্য কঠোরভাবে মেনে চলার আদেশ প্রদান করা হয়েছে।
আদালতের এই স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসন আন্দোলনকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাগত জানালেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছেন না। তাঁদের প্রবল আশঙ্কা, আদালতের এই সাময়িক আদেশের মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়া মাত্রই ট্রাম্প প্রশাসন ফের এই বহিষ্কার প্রক্রিয়া নতুন করে চালু করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আটক থাকা এসব আফগান অভিবাসীদের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে দুলছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক বা প্রত্যক্ষ কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান নেই। এ কারণেই সরাসরি আফগানিস্তানে ফ্লাইট না পাঠিয়ে সীমান্তঘেঁষা দেশ পাকিস্তান হয়ে তাদের আফগান সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার বিকল্প ছক তৈরি করেছিল মার্কিন প্রশাসন। তবে পুরো এই বহিষ্কার প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান সরকারের সুনির্দিষ্ট কী ধরনের ভূমিকা থাকবে, সে বিষয়ে ইসলামাবাদ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসমক্ষে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।























