কোরীয় উপদ্বীপে বিদ্যমান তীব্র ভৌগোলিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই এবার নতুন কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে উত্তর কোরিয়া। গতকাল সোমবার (২ নভেম্বর) চালানো এই সামরিক পরীক্ষার তথ্য আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি’ (কেসিএনএ)। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কেসিএনএর বরাতে জানা গেছে, সোমবারের এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঠিক এক দিন আগে অর্থাৎ গত রোববারও মাঝারি আকারের বিশেষ ‘গুচ্ছবোমার ওয়ারহেডে’র প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনী। নিজেদের সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সামগ্রিক কার্যকারিতা মূল্যায়নের অংশ হিসেবেই একের পর এক এসব ধারাবাহিক সামরিক পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছে যে, তাদের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে সংযুক্ত এই নতুন মাঝারি সাইজের গুচ্ছবোমার ওয়ারহেডটি সর্বোচ্চ মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ হেক্টর বিস্তৃত ভূমির কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু এক নিমেষে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। এর পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্রটির একেবারেই শেষ মুহূর্তের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও দিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে শত্রুর লক্ষ্যবস্তুর ওপর একদম শীর্ষভাগ থেকে সরাসরি আঘাত হানার নিখুঁত সক্ষমতা আগের চেয়ে বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেসিএনএ আরও জানায়, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সব ধরনের জটিলতা বিবেচনায় রেখেই এই স্পর্শকাতর পরীক্ষাটি চালানো হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র দপ্তরের মহাপরিচালকের স্পষ্ট বার্তা অনুযায়ী, নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং বহিরাগত সম্ভাব্য সব ধরনের হুমকি সফলভাবে প্রতিহত করতে সশস্ত্র বাহিনীর এই কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধি অপরিহার্য ছিল।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে একের পর এক নিত্যনতুন ও উচ্চ প্রযুক্তির মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি এসব পরীক্ষার তালিকায় যুক্ত রয়েছে আধুনিক আক্রমণাত্মক আত্মঘাতী ড্রোন, উচ্চ ক্ষমতার নির্ভুল লক্ষ্যভেদী আন্ডারওয়াটার টর্পেডো ব্যবস্থা এবং অত্যন্ত দ্রুতগতির মধ্যম পাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র।
এমন এক সময়ে উত্তর কোরিয়া এই পরীক্ষা চালাল যখন সীমান্তে দুই কোরিয়ার মধ্যকার পারস্পরিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকা দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলে একটি আকস্মিক স্থলমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন জন সেনা সদস্য গুরুতর আহত হন।
তবে উত্তর কোরিয়ার সোমবারের এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কিংবা রোববার পরিচালিত ওয়ারহেড পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
রোববারের সেই অস্ত্রের পরীক্ষার প্রযুক্তিগত গভীরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের সরকারি মুখপাত্র জ্যাং ডো-ইয়ং জানান, উত্তর কোরিয়ার উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রের কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও সার্বিক ধ্বংসক্ষমতা নিখুঁতভাবে নিরূপণ করতে দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে আরও ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, উত্তর কোরিয়া থেকে কোনো আকাশযান বা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হলেই তার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। নিজেদের গোয়েন্দা নজরদারির নিজস্ব কৌশলগত গোপনীয়তা রক্ষা, সামরিক অভিযানের সার্বিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এসব স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে।
প্রসঙ্গতঃ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকায় উত্তর কোরিয়ার যেকোনো ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সরাসরি নিষিদ্ধ করা থাকলেও, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কিন্তু সরাসরি সেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না। আর এই আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষার ক্ষেত্রে দেশটির ওপর একই ধরনের কড়া বৈশ্বিক বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হচ্ছে না।
























