তিউনিসিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার কালো ছায়া আরও ঘন হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রবীণ ও শীর্ষ বিরোধী নেতা আহমেদ নেজিব শেবিকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ—তার পরিবার এমনটাই জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদের ক্রমবর্ধমান দমনপীড়নের মাঝে এই গ্রেপ্তার যেন নতুন করে বলছে, আরব বসন্তের পর যে দেশে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ, সেখানে এখন বাতাসও ভয়ে ভারী।
৮১ বছরের শেবি কয়েকদিন আগেই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র মামলায় ১২ বছরের কারাদণ্ড পান—এক বিচার যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায় নিছক রাজনৈতিক প্রতিশোধ আর “ছদ্ম-বিচার” ছাড়া আর কিছুই নয়। রায় ঘোষণার পরও শেবি বলেছিলেন, এই অভিযোগের কোনও আইনি ভিত্তি নেই, সবই সাজানো নাটক।
তার আইনজীবী আমিন বউকার জানান, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এখন ভীতিকর হয়ে উঠেছে। জাতীয় স্যালভেশন ফ্রন্টের (এফএসএন) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেবি বহুদিন ধরেই সাঈদের কর্তৃত্ববাদী শাসনের তীব্র সমালোচক। ২০২১ সালে সাঈদের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই তিনি সরকারের একনায়কতন্ত্রমূলক সিদ্ধান্তগুলোর বিরোধিতা করে আসছিলেন।
অইন, অধিকার ও স্বাধীনতার রাজত্ব গড়ার প্রতিশ্রুতি এখন যেন ধুলোয় মিশে গেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আইনজীবী, কর্মী ও বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সরকার বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে।
গত সপ্তাহেই তথাকথিত “ষড়যন্ত্র মামলা”য় কয়েক ডজন বিরোধী নেতা ৪৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের মুখোমুখি হন। এর মধ্যেই গ্রেপ্তার হন মানবাধিকার কর্মী আয়াচি হাম্মামি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চাইমা ইসসা, যাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে পাঁচ থেকে বিশ বছরের সাজা।
গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েকদিন আগে আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেবি বলেছিলেন, “আমরা বিচারক নই, বরং রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অধীন কর্মচারীদের হাতে জিম্মি। এই বিচারহীনতার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য।”
তিউনিসিয়ার জেলখানার বাইরে বিরোধী নেতাদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। ক্ষুধার্ত ন্যায়বিচারের খোঁজে তারা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে—কারাগারের দরজার ওপারে বন্দি রয়েছে তাদের স্বপ্ন, তাদের বিশ্বাস।
আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই মামলাকে “অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে ভরা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলেছে, যাদের একমাত্র অপরাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চা করা—তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টও একই আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট সাঈদ এটিকে “স্পষ্ট হস্তক্ষেপ” হিসেবে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বরং তিউনিসিয়ার কাছ থেকেই শেখার চেষ্টা করুক।
জাতীয় স্যালভেশন ফ্রন্ট বলেছে, এটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূলের একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যেখানে সত্যকে লুকিয়ে রাখা এবং ভিন্ন মতকে অপরাধে পরিণত করাই মূল লক্ষ্য। তাদের ভাষায়, এই রায় “ন্যায়বিচার হত্যা” এবং দেশের ভাবমূর্তির ওপরে এক গভীর আঘাত।
তিউনিসিয়ার আকাশে আবারও অস্থিরতার মেঘ। গণতন্ত্রের সেই উজ্জ্বল সূর্য—যা একসময় বিশ্বকে আশা দেখিয়েছিল—আজ যেন কুয়াশায় ঢাকা, দমবন্ধ রাজনীতির ভারে নত হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ।
















