বিমানবাহী রণতরিতে ব্যবহারের জন্য তৈরি এই চালকবিহীন উড়োজাহাজ মূলত আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করবে। তবে এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর চালকবিহীন যুদ্ধ সক্ষমতারও ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বিমানবাহী রণতরিতে ব্যবহারের জন্য একটি নতুন চালকবিহীন উড়োজাহাজ তৈরি করছে, যার প্রধান কাজ হবে আকাশে যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহ করা। পাশাপাশি এটি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মতো কাজেও ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই উড়োজাহাজের উন্নয়ন কার্যক্রম কয়েক দশকের পুরোনো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। শুরুতে বিমানবাহী রণতরিতে ব্যবহারের জন্য চালকবিহীন যুদ্ধ উড়োজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও পরে এর প্রধান ভূমিকা হিসেবে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলোকে সেই দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে মূল যুদ্ধ অভিযানে নিয়োজিত করা।
প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়েছে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। এরপর মে মাসে সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরুর অনুমোদন দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট ছিয়াত্তরটি উড়োজাহাজ তৈরির কথা রয়েছে। এর মধ্যে সাতষট্টিটি কার্যকর ব্যবহারের জন্য এবং বাকি নয়টি পরীক্ষামূলক ও উন্নয়ন কাজে ব্যবহারের জন্য রাখা হবে।
নৌবাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি প্রায় পাঁচশ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে কমপক্ষে চৌদ্দ হাজার পাউন্ড জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে। এর ফলে বিমানবাহী রণতরিতে থাকা যুদ্ধবিমানগুলোর কার্যকর পরিচালন দূরত্ব বাড়বে এবং আকাশে জ্বালানি নেওয়ার জন্য যুদ্ধবিমান ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে।
তবে প্রকল্পটি সময়সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে না। প্রাথমিক পরিকল্পনার তুলনায় এর কার্যকর ব্যবহারের সময় কয়েক বছর পিছিয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক কার্যক্ষমতা অর্জনের সম্ভাব্য সময় হিসেবে দুই হাজার ঊনত্রিশ সাল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত ঝুঁকি, উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যা এবং শ্রমিক ধর্মঘটের মতো বিভিন্ন কারণে এই বিলম্ব হয়েছে।
প্রকল্পটির ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পে ব্যয় হতে পারে প্রায় এক হাজার নয়শ চল্লিশ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতিটি উড়োজাহাজের গড় সংগ্রহ ব্যয় প্রায় পঁচিশ কোটি আটান্ন লাখ ডলার হিসেবে ধরা হয়েছে।
চালকবিহীন এই উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সফটওয়্যারও প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিমানবাহী রণতরিতে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের মাধ্যমে উড়োজাহাজ পরিচালনা, যোগাযোগ ও বিভিন্ন মিশন পরিকল্পনা করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে একই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অন্যান্য চালকবিহীন উড়োজাহাজ পরিচালনাতেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেস প্রকল্পটির ব্যয়, সাইবার নিরাপত্তা এবং পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই সীমিত উৎপাদন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নজরদারি করছে। পরীক্ষার সময় বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা ধরা পড়লে উৎপাদন ও সময়সূচিতে আরও বিলম্ব হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু আকাশে জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভবিষ্যতের বিমানবাহী রণতরিভিত্তিক চালকবিহীন যুদ্ধব্যবস্থার জন্য একটি পরীক্ষামূলক ভিত্তি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে চালকবিহীন উড়োজাহাজের ব্যবহার দ্রুত বাড়ায় মার্কিন নৌবাহিনীও ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের প্রযুক্তির ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়ন করছে।
প্রকল্পটি সফল হলে বিমানবাহী রণতরির যুদ্ধবিমানগুলো আরও দীর্ঘ সময় ও দূরত্বে অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। একই সঙ্গে নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ চালকবিহীন যুদ্ধবিমান ব্যবস্থার বিকাশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
















