আফগানিস্তানের হেরাতে জাতিসংঘের সহায়তা মিশনের দুই আফগান কর্মীকে আটক করেছে তালেবানের গোয়েন্দা সংস্থা। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। এমনকি আটক কর্মীদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতিও জাতিসংঘকে দেওয়া হয়নি। ঘটনাটি আফগানিস্তানে আইনগত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন জানিয়েছে, হেরাতে আটক দুই কর্মীকে তালেবান নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিয়ে গেছে। তাঁদের আটকের কারণও প্রকাশ করা হয়নি। জাতিসংঘ দ্রুত আটকের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া এবং জাতিসংঘের কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নির্বিচারে আটক, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠে আসছে। সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তে প্রশাসনিক নির্দেশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ক্ষমতা বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরাও এর বাইরে নন। জাতিসংঘের নথিতে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পরবর্তী কয়েক বছরে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে নির্বিচারে আটক ও গ্রেপ্তার, নির্যাতন, দুর্ব্যবহার, হুমকি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে।
হেরাতেই সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের পোশাকসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বহু নারীকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। পরে সেখানে বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনা দেশটিতে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
জাতিসংঘের কর্মীদের আটকের ঘটনা তাই শুধু দুই ব্যক্তির বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ এবং দেশটির সাধারণ নাগরিকদের জন্য আইনের সুরক্ষা কতটা কার্যকর, সেটিও এই ঘটনার মাধ্যমে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাউকে আটক করার ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইন, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং স্বাধীন তদন্তের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রমও আইনের আওতায় পরিচালিত হওয়া উচিত। গোপনে আটক এবং জবাবদিহির অভাব থাকলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তবে আফগানিস্তানের মানবিক সংকটের কারণে তালেবানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করাও সহজ নয়। দেশটির সাধারণ মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি। কিন্তু মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এবং রাজনৈতিক স্বীকৃতি বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়।
আটক দুই কর্মীর বিষয়ে দ্রুত ব্যাখ্যা, তাঁদের সঙ্গে জাতিসংঘের যোগাযোগের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। জাতিসংঘের কর্মীদের বিশেষ অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক নীতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার প্রায় পাঁচ বছর পরও মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—দেশটিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিকার অর্থে আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোতে নির্বিচার ক্ষমতার ব্যবহারই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
হেরাতে জাতিসংঘের দুই কর্মীর আটক সেই প্রশ্নকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য ঘটনাটি আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বাধীন কার্যক্রম নিশ্চিত করার বিষয়েও কঠোর অবস্থান প্রয়োজন।
















