ভারতের কৃষিপণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর মান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে দুর্বলতার কারণে একের পর এক রপ্তানি বাধার মুখে পড়ছে দেশটি।
জাপান, চীন ও ইউরোপের বাজারে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় ভারতীয় কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জাপান ভারতীয় আম আমদানি স্থগিত করেছে, চীন কয়েকটি ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকের অনুমোদন বাতিল করেছে এবং ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় মসলার ওপর বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
চলতি বছরের মার্চে উত্তর ভারতের একটি ফল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে জাপানি পরিদর্শকেরা আম জীবাণুমুক্তকরণ ও সনদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তোলেন। এরপর মার্চের শেষ দিকে জাপানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, নির্দিষ্ট সময়ের পর দেওয়া পরিদর্শন সনদযুক্ত ভারতীয় আমের চালান গ্রহণ করা হবে না।
এর ফলে আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, বাঙ্গানাপল্লি, চৌসা ও মাল্লিকা—এই ছয় ধরনের আমের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জাপানের বাজারে ভারতীয় আমের বাণিজ্যিক পরিমাণ খুব বড় না হলেও এই বাজারের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ জাপান উচ্চমূল্যে আম কেনে এবং দেশটির অনুমোদন অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও ভারতীয় পণ্যের মানের প্রতি আস্থা তৈরিতে সহায়তা করে।
মুম্বাইয়ের এক রপ্তানিকারক জানান, জাপানের বাজারে জায়গা করে নিতে তাঁরা কয়েক বছর ধরে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তাই একটি মৌসুমে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, দীর্ঘদিনের আস্থার সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের আমচাষিরাও এই পরিস্থিতিতে সমস্যায় পড়েছেন। প্রচণ্ড গরমে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে আমের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে জাপানের বাজার বন্ধ হওয়ায় অনেক রপ্তানিকারকের পণ্য গুদামে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। এপ্রিল মাসে চীন তিনটি ভারতীয় চাল রপ্তানিকারকের আমদানি অনুমোদন বাতিল করে। চীনা কর্তৃপক্ষ চালের চালানে জিনগত পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়ার দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকেরা তা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, চাল পাঠানোর আগেই অনুমোদিত পরীক্ষাগারে পণ্য পরীক্ষা করে জিনগত পরিবর্তনমুক্ত সনদ নেওয়া হয়েছিল।
ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানির বড় অংশজুড়ে রয়েছে চাল। গত অর্থবছরে দেশটি রেকর্ড পরিমাণ চাল রপ্তানি করেছে। ফলে চীনের বাজারে তৈরি হওয়া এই বাধা রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পরে চীনের বাজারের জন্য জিনগত পরিবর্তন শনাক্তকরণ পরীক্ষায় অনুমোদিত পরীক্ষাগারের তালিকা প্রকাশ করে। তবে বিশেষায়িত পরীক্ষাগারের সংখ্যা কম হওয়ায় উত্তর ভারতের অনেক রপ্তানিকারককে নমুনা পরীক্ষার জন্য কয়েক শ কিলোমিটার দূরে পাঠাতে হচ্ছে।
শুধু আম ও চাল নয়, ভারতীয় মসলার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারে সতর্কতা বাড়ছে। হংকং কয়েক ধরনের ভারতীয় মসলা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। পরীক্ষায় কয়েকটি নমুনায় নির্ধারিত মান থেকে বিচ্যুতিও পাওয়া গেছে।
ইউরোপীয় বাজারও ভারতীয় জিরার ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। এর আগে বিপুলসংখ্যক মসলা চালানে সতর্কতা জারির পর ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ আমদানি পরীক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার একটি বড় কারণ ভারতের কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার খণ্ডিত কাঠামো। একজন কৃষক পণ্য বিক্রি করেন সংগ্রাহকের কাছে, সংগ্রাহক তা দেন ব্যবসায়ীর কাছে এবং পরে পণ্য যায় প্রক্রিয়াজাতকারীর কাছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় জমিতে কোন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে বা কখন ব্যবহার করা হয়েছে, তার তথ্য অনেক সময় আর পাওয়া যায় না।
আন্তর্জাতিক বাজারে এখন কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ ও পণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা increasingly গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভারতের অনেক অঞ্চলে এই ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্তভাবে চালু হয়নি।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশ খুবই সীমিত। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
ভারতের কৃষিপণ্য রপ্তানির অবকাঠামোতেও ঘাটতি রয়েছে। দেশটির নিবন্ধিত পণ্য প্যাকেটজাতকরণ কেন্দ্রের সংখ্যা সীমিত এবং এর বড় অংশ কয়েকটি রাজ্যে কেন্দ্রীভূত। পর্যাপ্ত শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয়ও বেড়ে যায়।
ভারতের অধিকাংশ কৃষক ছোট জমির মালিক। ফলে দেশজুড়ে একই মান বজায় রেখে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থবির নয়। গত এক দশকে ভারতে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রপ্তানি সনদের সংখ্যাও আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, মসলা, চা, ফল ও সবজিতে অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং ছত্রাকজাত বিষাক্ত উপাদান নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হচ্ছে। পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন বাড়ানোর ওপর ভারত এতদিন বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু বেশি উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি পর্যায়ে পণ্যের মান প্রমাণ করাও জরুরি।
থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল ও চিলির মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো কৃষিপণ্যের উৎস শনাক্তকরণ, কৃষক প্রশিক্ষণ ও শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থায় দ্রুত বিনিয়োগ করছে। ভারতের জন্যও একই ধরনের অবকাঠামো ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ভারতের কৃষি খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মরত। তাই কয়েকটি রপ্তানি চালান আটকে যাওয়ার বিষয়টি শুধু ব্যবসায়ীদের সমস্যা নয়; এর প্রভাব কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকারী ও স্থানীয় বাজারেও পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই ভারতের সামনে বড় একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দেশটি বিশ্ববাজারের জন্য পর্যাপ্ত কৃষিপণ্য উৎপাদন করতে পারলেও সেই পণ্যের নিরাপত্তা, মান ও উৎস সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা কতটা নিশ্চিত করতে পারছে?
বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে ভারতের জন্য এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, মাঠ থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ ও মানসম্মত করে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ।
















