পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক পথে ফেরার আভাস; নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক উত্তজনা ছাপিয়ে মাসকাটে দুই পক্ষের নিবিড় আলোচনা
মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিরতা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকির মধ্যেই ওমানের মাসকাটে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিবিড় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদির মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বিষয়টিকে একটি ‘ভালো সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। গত জুন মাসে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ইরানের প্রধান পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলার পর দুই বৈরী দেশের মধ্যে এই আলোচনার ফলে আপাতত সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা স্থগিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্পের ‘জিরো নিউক্লিয়ার’ নীতি এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনড় অবস্থান এই কূটনৈতিক অগ্রযাত্রাকে কতটা সফল করবে, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওমানের মাসকাটে তাঁর ওমানি সমকক্ষ সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদির সঙ্গে এক গভীর ও নিবিড় আলোচনা শেষ করেছেন। শুক্রবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন আরব সাগর ও উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে ইরানের তেল রপ্তানি বহরের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিচ্ছে।
ট্রাম্পের স্পষ্ট বার্তা—যদি ইরান কোনো সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে তাদের ‘অত্যন্ত কঠোর’ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরানকে ৩.৬৭ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর তেহরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ শুরু করেছে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, ইরান বর্তমানে তাদের গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতি অত্যন্ত আধুনিক করেছে, যা সাত বছর আগে সম্ভব ছিল না। এখনকার আলোচনায় তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাওয়ার অধিকার বজায় রেখেই দীর্ঘ মেয়াদে কার্যক্রম স্থগিত রাখতে রাজি হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ চাপের মুখে রয়েছে। গত জুনে নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোর পরমাণু স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা বড় ক্ষতির শিকার হয়েছে। অন্যদিকে, গত জানুয়ারিতে ইরানে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক বিক্ষোভ রাজনৈতিক রূপ নিলে সেখানে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে, যা দেশটিকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় ইরানকে তিন বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তৃতীয় কোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক অংশীদারদের বিষয়ে কিছুটা নমনীয় হবে কি না, তা নিয়ে চলছে দর কষাকষি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বিধিনিষেধ চাইছে, তেহরান তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে অনড়।
ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের প্রতি ভুল নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে কেবল বিচ্ছিন্ন ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাখায় সেখানকার সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সমালোচকদের মতে, একতরফা নিষেধাজ্ঞার বদলে আংশিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বাণিজ্য বৃদ্ধি করলে ইরানের ভেতরেই একটি মধ্যপন্থী মধ্যবিত্ত শ্রেণি শক্তিশালী হতে পারতো, যা দেশটিতে গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন আনতে সহায়ক হতো।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন স্বীকার করছে যে, ইরানে আপাতত ‘শাসন পরিবর্তন’ সম্ভব নয় কারণ বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখনো অনুগত রয়েছে এবং সংহত কোনো বিরোধী পক্ষ সেখানে নেই। ইসরায়েল এই আলোচনাকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করলেও আঞ্চলিক নেতারা ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনকে একটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তিকালীন চুক্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।
















