১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার এই নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর এটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর থেকে ৫৫ বছরের ইতিহাসে এই নির্বাচনকে একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায় বলা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের একদলীয় আধিপত্য, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে দেশ।
বাংলাদেশ এক নজরে
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩০ লাখের বেশি, যা বিশ্বে অষ্টম। গত ২৫ বছরে দেশটির অর্থনীতি দ্রুত বেড়েছে, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৪৬১ বিলিয়ন ডলার, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯৯০ ডলার।
ধর্মীয়ভাবে বাংলাদেশ প্রধানত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলমান, ৮ শতাংশ হিন্দু এবং বাকি অংশ অন্যান্য ধর্মের অনুসারী।
তরুণ ভোটারই বড় ফ্যাক্টর
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। ১৮ বছরের বেশি বয়সী ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ, অর্থাৎ ৪৪ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। প্রায় ৫০ লাখ তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ৩৬৬ জন মানুষ বাস করে। রাজধানী ঢাকা একাই প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষের শহর, যা অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
রাষ্ট্র কাঠামো কেমন
বাংলাদেশ একটি সংসদীয় গণতন্ত্র। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিক প্রধান, যিনি সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩৫০টি, এর মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত এবং ৫০টি নারীদের জন্য সংরক্ষিত।
দেশটি প্রশাসনিকভাবে ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা ও ৪৯৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত।
কারা কারা লড়ছে
২০২৬ সালের নির্বাচনে ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। মোট প্রার্থী ১ হাজার ৯৮১ জন, এর মধ্যে ২৪৯ জন স্বতন্ত্র।
শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের নিবন্ধন নির্বাচন কমিশন স্থগিত করায় তারা এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
প্রধান দলগুলো হলো
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, নেতৃত্বে তারেক রহমান
জামায়াতে ইসলামী, নেতৃত্বে শফিকুর রহমান, যারা জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ কয়েকটি ইসলামী দলের সঙ্গে জোট করেছে
জাতীয় নাগরিক পার্টি, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া নতুন দল
জাতীয় পার্টির দুটি ধারা
বাম গণতান্ত্রিক জোট
আমার বাংলাদেশ পার্টি, একটি মধ্যপন্থী সংস্কারবাদী দল
আগের নির্বাচনগুলো কী বলছে
২০০১ সালে বিএনপি বড় জয় পেলেও ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগ একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, বিরোধী দল অংশ নেয়নি বা কার্যত কোণঠাসা ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন ঘটে।
নেতৃত্বের ইতিহাস সংক্ষেপে
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম নেতা। ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয় সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদের শাসনকাল শেষে নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্র ফেরে। এরপর দীর্ঘদিন ক্ষমতা ঘুরেছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারার ইতি টানে।
২০২৬ সালের নির্বাচন সেই ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়। তরুণ ভোটার, নতুন দল ও পরিবর্তনের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
















