বাংলাদেশ আগামী নভেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকলেও অর্থনীতির বর্তমান চিত্র বেশ নাজুক। নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দেশের অর্থনীতিকে একটি কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে।
গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা ২০২২ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং মার্চ ২০২৬-এ তা দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। এতে মানুষের প্রকৃত আয় কমছে এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
বিনিয়োগ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, দক্ষতার ঘাটতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা তৈরি করছে।
ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও খেলাপি ঋণের চাপ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে সেগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
রাজস্ব আহরণও বড় চ্যালেঞ্জ। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহ মাত্র ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা অত্যন্ত কম। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও অনেক পিছিয়ে। একই সময়ে উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ায় অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা স্থায়ী নয়। তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানি আয় কমে যাওয়াও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে পণ্য বৈচিত্র্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা জোরালো হচ্ছে।
প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া, বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ হ্রাস, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে কমে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই এখনই উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে করব্যবস্থা সহজীকরণ, ভ্যাট কাঠামো সংস্কার, ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর সংগ্রহ এবং ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে এবং আরও বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল অর্থনীতির পথে এগোতে সক্ষম হবে।
















