দীর্ঘদিন জার্মানিতে বসবাসের পর সম্প্রতি নিজের শহর আলেপ্পোতে ফিরে গিয়ে আলহাকাম শার একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কোনো হোটেলে বা বন্ধুর বাসায় থাকবেন না। বরং আলেপ্পোর পুরোনো শহরে তাঁর বাবার পরিত্যক্ত অফিসেই রাত কাটাবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, একটি কক্ষেও ঠিকভাবে বন্ধ করার মতো দরজা বা জানালা নেই। শীতের তীব্রতায় রাত কাটাতে তাঁকে বিশেষ স্লিপিং ব্যাগ কিনতে হয়, তবু বহু রাত পা জমে যাওয়ার মতো ঠান্ডায় ঘুম ভেঙেছে।
তবু আফসোস নেই শারের। প্রায় এক দশক পর নিজের শহরে ফিরে তিনি শুধু স্মৃতির শহরে অতিথি হয়ে থাকতে চাননি, বরং নিজেকে আবার আলেপ্পোর মানুষ হিসেবে অনুভব করতে চেয়েছেন। স্বল্প সময়ের সফরে তিনি পুরোনো পারিবারিক বাড়ির কিছু সংস্কারও শুরু করেন, যেটি যুদ্ধের সময় লুটপাট ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নতুন ধাতব দরজা লাগিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, বাড়িটি আর পরিত্যক্ত নয়।
শারের অভিজ্ঞতা হাজারো সিরীয়ের গল্পের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ যুদ্ধ ও অবহেলার পর আলেপ্পোতে ধীরে ধীরে মানুষ ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ধ্বংসস্তূপের শহর কি আবার আগের মতো হয়ে উঠতে পারবে?
একসময় সিরিয়ার সবচেয়ে জনবহুল শহর ছিল আলেপ্পো। ঐতিহাসিকভাবে এটি ছিল সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র এবং দেশের শিল্পের রাজধানী। তবে ২০১১ সালে যুদ্ধ শুরুর আগেই শহরটি অবহেলা ও বিনিয়োগের অভাবে ভুগছিল। যুদ্ধ শুরু হলে আলেপ্পো দ্বিখণ্ডিত হয়—পশ্চিম অংশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে, পূর্ব অংশ বিরোধীদের হাতে। ২০১৬ সালে ভয়াবহ হামলার মাধ্যমে পূর্ব আলেপ্পো পুনর্দখল করে সরকারপন্থী বাহিনী, যার ফলে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং হাজারো মানুষ উৎখাত হয়।
আসাদ সরকারের পতনের পরও আলেপ্পোর বহু এলাকা পুনর্গঠন হয়নি। শিল্পাঞ্চলগুলো পরিণত হয়েছে ভূতুড়ে নগরীতে। বিদ্যুৎ ও পানির সংকট নিত্যদিনের বাস্তবতা। উত্তর সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এখনো লাখো মানুষ শরণার্থী শিবির ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করছে, যাদের বড় অংশ নারী ও শিশু।
বর্তমান সরকার আলেপ্পো পুনর্গঠনে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। পুরোনো শহরের ঐতিহাসিক বাজার, দুর্গ ও গ্র্যান্ড উমাইয়া মসজিদের অংশবিশেষ সংস্কার করা হয়েছে। পানির পাইপলাইন ও আলো বসানো হয়েছে দুর্গসংলগ্ন এলাকায়। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, এই বিশাল শহরকে ফিরিয়ে আনতে আরও বড় বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুনর্গঠনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন। আলেপ্পোর মানুষ চান, সিদ্ধান্ত যেন কেবল দামেস্ক থেকে চাপিয়ে দেওয়া না হয়, বরং স্থানীয়দের মতামতও গুরুত্ব পায়। বিদ্যুৎ সংকট, অবকাঠামোর ভাঙন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাপ—সব মিলিয়ে শহরটি এখনো সংকটে।
তবু আশা পুরোপুরি নিভে যায়নি। অনেক আলেপ্পোবাসী বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ অবহেলার এক ইতিবাচক দিক হলো শহরটি অতিরিক্ত অভিজাতকরণ থেকে বেঁচে গেছে। সংস্কৃতি, সংগীত, খাবার আর বৈচিত্র্যের যে ঐতিহ্য আলেপ্পোকে আলাদা করত, সেটি হয়তো আবার ফিরবে।
অনেকে ফিরছেন, কেউ বাধ্য হয়ে, কেউ ভালোবাসা থেকে। আলহাকাম শারের মতো অনেক প্রবাসী সিরীয় বলেন, খুব বেশি কিছু লাগবে না তাঁদের ফিরিয়ে আনতে—একটি স্থিতিশীল আয় আর ন্যূনতম নিরাপত্তাই যথেষ্ট।
আলেপ্পো হয়তো আর আগের মতো হবে না। কিন্তু ধ্বংসের মাঝেও যারা ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখছে, তাদের চোখে শহরটি এখনো ডাকছে—ফিরে আসার জন্য, নতুন করে বাঁচার জন্য।
















