“আপত্তিবাদীদের পরিচয় গোপন রাখা হলেও তারা অচেনা নন। অথচ সরকারের নীরবতা এই প্রবণতাকে আরও বৈধতা দিচ্ছে—যা শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের অংশ করে তুলছে।”
১২ অক্টোবর ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ‘সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী’ আয়োজিত শরৎ উৎসব হঠাৎ করেই স্থগিত হলো। আয়োজনের অনুমতি ছিল, পরিকল্পনাও সম্পন্ন। কিন্তু আগের রাতে ‘ফোনে আসা আপত্তি’র কারণে অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেল।
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের বলা হয়েছে, তাদের দলের একজনকে “ফ্যাসিবাদের দোসর” হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে—এমন অভিযোগের পর ‘বিশৃঙ্খলা এড়াতে’ অনুমতি স্থগিত করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো—এই আপত্তি কোথা থেকে এলো? কারা এই অদৃশ্য আপত্তিকারী, যাদের ‘অনেকে’ বলা হয়, কিন্তু কখনো নাম প্রকাশ পায় না?
‘কিছু লোক’ থেকে ‘অনেকে’: আপত্তির রাজনৈতিক রূপান্তর
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—লালন উৎসব, রবীন্দ্র স্মরণ, নাট্যোৎসব, এমনকি চারুকলা অনুষদের আয়োজন—একইভাবে বন্ধ হয়েছে। প্রতিবারই যুক্তি একই: ‘কিছু লোক’ বা ‘একদল ব্যক্তি’র আপত্তি।
ধীরে ধীরে এই ‘কিছু লোক’ পরিণত হয়েছে ‘অনেকে’-তে। নাম নেই, পরিচয় নেই—কিন্তু তাদের ক্ষমতা আছে, ভয় আছে। তাদের ইশারায় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন, পুলিশ সবাই সাড়া দেয়।
এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে শিল্পী রফিকুন নবী—রনবী নামেই পরিচিত—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে উঠতে পারেননি, কারণ “কিছু লোক” নাকি তার উপস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা করতে পারে। কারা সেই লোক? কেউ জানে না।
সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাজনীতি: আপত্তির আসল লক্ষ্য কী?
‘ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক মৈত্রী’ বা ‘তোহিদী জনতা’—এই নামে আগেও দেখা গেছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কখনো লালন উৎসব, কখনো নাট্যোৎসব, আবার কখনো রবীন্দ্র স্মরণ।
এগুলো শুধু ধর্মীয় বা নৈতিক ‘আপত্তি’ নয়; এগুলো সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের অংশ, একধরনের রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং।
বাংলাদেশে সংস্কৃতি মানে কেবল গান-বাজনা নয়, বরং পরিচয়ের প্রকাশ, চিন্তার প্রতিফলন। তাই যারা আপত্তি তোলে, তারা আসলে সংস্কৃতি নয়—চিন্তার স্বাধীনতাকেই লক্ষ্যবস্তু করছে।
রাষ্ট্রের নীরবতা: রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সরকারের নীরবতা। কেউ জানে না, সরকার এসব ঘটনার পাশে না বিপক্ষে।
কিন্তু নীরবতাই একধরনের অবস্থান। রাষ্ট্র যখন ‘আপত্তিবাদীদের’ বিরুদ্ধে কথা বলে না, তখন সেটি পরোক্ষভাবে তাদের অংশীদার হয়ে ওঠে।
লেখক বলেন, “এই নির্বাক অবস্থাই অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশেষ রাজনীতির অংশভাগী করে তুলেছে।”
‘আপত্তির কারখানা’ তৈরি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায়
যে দেশে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার আসে, সেখানে স্বাধীন মত প্রকাশের নিশ্চয়তা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্র নিজেই পরিণত হচ্ছে আপত্তির কারখানার নীরব পৃষ্ঠপোষকে।
সরকার কোন বিষয়ে কথা বলবে, কোন বিষয়ে নীরব থাকবে—এ সিদ্ধান্তই বলে দেয় সরকারের আদর্শিক অবস্থান কোথায়।
স্বাধীনতার পরও বন্দি সংস্কৃতি
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর এক অদৃশ্য সেন্সরশিপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কোথাও পুলিশ অনুমতি দেয় না, কোথাও ‘জনরোষ’-এর ভয় দেখানো হয়, কোথাও ‘ফ্যাসিস্ট ট্যাগ’ ঝুলিয়ে অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়।
এইসব বিচ্ছিন্ন নয়—এগুলো ধারাবাহিক, সংগঠিত এবং গভীরভাবে রাজনৈতিক।
প্রশ্ন একটাই: ‘আপত্তির কারখানা’ কোথায়, কে চালাচ্ছে সেটি?
যতক্ষণ পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজে না পাই, ততক্ষণ সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতি—সবকিছুই থাকবে সেই অদৃশ্য আপত্তিকারীদের নিয়ন্ত্রণে।















