অ্যাম্বুলেন্সেও মিলছে না তেল; মজুদদারদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি ও সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান
দেশে চলমান জ্বালানি তেলের সংকট এক ভয়াবহ ও নৃশংস রূপ পরিগ্রহ করেছে। নড়াইলের তুলারামপুর এলাকায় তেল না পেয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে মেসার্স তানভীর ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার নাহিদকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে নড়াইল-যশোর মহাসড়কে এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ট্রাকচালক তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ম্যানেজারকে প্রাণনাশের হুমকি দেন এবং পরে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে পেছন থেকে সজোরে চাপা দিয়ে পালিয়ে যান। এই ঘটনায় পাম্পের আরও এক কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। জ্বালানি তেলের সামান্য সংকটের জেরে এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড জনমনে চরম আতঙ্ক ও রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে আরও ঘনীভূত করেছে।
নড়াইলের এই ঘটনার সমান্তরালে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংগ্রহের লড়াই সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। নীলফামারীতে তেলের অভাবে চালককে অ্যাম্বুলেন্স ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা গেছে, যা স্বাস্থ্যসেবায় চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই, কারণ এর সিংহভাগই দেশীয় রিফাইনারিতে উৎপাদিত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পেট্রোলের শতভাগ এবং অকটেনের বড় একটি অংশ দেশীয় কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও পাম্পগুলোতে মাইলের পর মাইল যানবাহনের সারি এবং ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা মূলত এক শ্রেণির পাম্প মালিক ও বেসরকারি রিফাইনারি ইউনিটের বাজার কারসাজির ফসল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ থাকলেও, দেশের ভেতরে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চোরাই পথে বেশি দামে তেল বিক্রির সিন্ডিকেট এখন অধিক সক্রিয়।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। শনিবার বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান জানিয়েছেন যে, দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে এবং নতুন করে ৪ লাখ মেট্রিক টন তেল আসার প্রক্রিয়ায় আছে। তিনি তেলের চোরাচালান ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। এরই প্রেক্ষিতে সারা দেশে পরিচালিত অভিযানে নাটোর, ফরিদপুর, শিবগঞ্জ ও যশোরে হাজার হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুতকৃত তেলের সন্ধান পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ফরিদপুরে ‘পেট্রোল নেই’ লিখে রাখা পাম্পে তল্লাশি চালিয়ে ২৮ হাজার লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং রিফাইনারি থেকে পাম্প পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি নিশ্চিত করতে না পারলে এই কৃত্রিম সংকট নাগরিক জীবনে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।















