মিন্তদু ও কিনশি নদে সাতটি নতুন বাঁধের পরিকল্পনা; শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে সিলেটের সারি-গোয়াইন ও সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদী
ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা মেঘালয়ের খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়ে পরিকল্পিত একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশের মেঘনা অববাহিকার জন্য এক বড় ধরনের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্য সরকার মিন্তদু ও কিনশি নদের ওপর অন্তত সাতটি নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। বিশেষ করে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘মিন্তদু লেশকা স্টেজ-২’ প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের শুরু থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এই নদটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে ‘সারি গোয়াইন’ নাম ধারণ করেছে। অন্যদিকে, কিনশি নদ সুনামগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ‘যাদুকাটা’ নাম নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, একের পর এক এসব বাঁধ বা ‘ক্যাসকেড ড্যাম’ নির্মিত হলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
মেঘালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে রাজ্যের নতুন বিদ্যুৎ নীতি প্রণয়নের পর থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন করে চাপ তৈরি করা হয়েছে। মিন্তদু নদের ওপর বর্তমানে চালু থাকা ‘স্টেজ-১’ প্রকল্পের পাশাপাশি উজানে ‘সেলিম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প’ এবং ভাটিতে ‘স্টেজ-২’ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের দাবি, এগুলো ‘রান অব দ্য রিভার’ বা স্রোতনির্ভর প্রকল্প হওয়ায় পানির কোনো ক্ষতি হবে না। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে একের পর এক বাঁধ দিয়ে টানেলের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নিলে আদি নদীখাত প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এর ফলে জৈন্তাপুর ও তাহিরপুর উপজেলার কৃষি, মৎস্য সম্পদ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
২০১৩ সাল থেকেই বাংলাদেশ এই প্রকল্পগুলোর বিষয়ে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আপত্তি জানিয়ে আসছে। মেঘালয়ের স্থানীয় বাসিন্দারাও এই বাঁধগুলোর কারণে ইলিশসহ অন্যান্য পরিযায়ী মাছ বিলুপ্তি এবং হঠাৎ আসা পাহাড়ি বন্যা বা হড়কা বানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেঘালয় ও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আবহাওয়া বদলে যাওয়ার ফলে একদিনে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো গবেষণা বা সম্মিলিত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Cumulative Impact Assessment) ছাড়াই ভারতের এককভাবে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়াকে ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে দেখছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ না করলে এই প্রকল্পগুলো দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নতুন করে ছায়া ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।















