বিএনপির প্রতি দিল্লির নমনীয় বার্তা; ‘সমঅধিকার’ ভিত্তিতে সম্পর্কের পুনর্গঠন চান ফখরুল
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান নজিরবিহীন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সম্পর্কের মোড় ঘোরানোর বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ফরেন পলিসির কলামিস্ট মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, দীর্ঘদিনের তিক্ততা ও অবিশ্বাস কাটিয়ে দিল্লি এখন বাংলাদেশের আগামী নেতৃত্বের সাথে একটি ‘সমঝোতার পথ’ খুঁজছে। বিশেষ করে জামায়াতের সংশ্রব ত্যাগ করায় বিএনপির প্রতি দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গিতে গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন এবং তাঁর ভারতে আশ্রয়ের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দিল্লি ও ঢাকা উভয়ই এখন একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্কের দিকে এগোতে চাইছে।
কৌশলগত পরিবর্তনের নেপথ্যে ‘মোদি-জয়শঙ্কর’ ফ্যাক্টর
কুগেলম্যান তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠানো এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সশরীরে জানাজায় অংশ নেওয়া কেবল সৌজন্য ছিল না; এটি ছিল দিল্লির একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা।
- জামায়াত ইস্যু: দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির বর্তমান দূরত্ব দিল্লিকে আশ্বস্ত করেছে। এর ফলে বিএনপি এখন ভারতের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘গ্রহণযোগ্য’ হয়ে উঠেছে।
- তারেক রহমানের ভূমিকা: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জাতীয় ঐক্যের ডাক এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে ভারত।
চরম উত্তেজনা ও অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এখনো বড় কিছু বাধা বিদ্যমান রয়েছে যা কুগেলম্যান বিস্তারিত আলোচনা করেছেন:
১. হাসিনা ও আইনি জটিলতা: শেখ হাসিনাকে আশ্রয় প্রদান এবং বাংলাদেশের আদালতে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে হস্তান্তরে ভারতের অস্বীকৃতি ঢাকার জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
২. ক্রিকেট ও আবেগ: আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা এবং বিশ্বকাপে ভারত সফর নিয়ে সংশয় দুই দেশের মানুষের আবেগকে বিপরীতমুখী করে তুলেছে।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর ভারতবিরোধী অবস্থান এবং ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর দিল্লির অবস্থানকে প্রায়ই কঠোর হতে বাধ্য করছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, অতীতের একতরফা বন্ধুত্বের পরিবর্তে ভারত যদি ‘সমঅধিকার’ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগোতে চায়, তবেই সম্পর্ক টেকসই হবে। এটি দিল্লির জন্য একটি পরোক্ষ বার্তা যে, আগামীতে সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক মর্যাদা।
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পরীক্ষা নয়, এটি দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের পুনর্জন্মের এক বড় উপলক্ষ। ভারত ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে, তারা বাংলাদেশে জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া যেকোনো নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে এই পথ সুগম হবে কি না, তা নির্ভর করছে উভয় দেশের নেতৃত্বের সাহসিকতা এবং বাস্তবমুখী কূটনীতির ওপর।
















