ফুটবলে হেড করে গোল করার রোমাঞ্চ খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা অনুভূতি তৈরি করে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বছরের পর বছর মাথা দিয়ে বল মারার অভ্যাস ভবিষ্যতে মারাত্মক স্নায়ুজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেশাদার ফুটবলার ও আমেরিকান ফুটবল খেলোয়াড়দের মধ্যে আলঝেইমার, পারকিনসন ও মোটর নিউরন ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।
মাথায় আঘাতজনিত ক্ষতির বিষয়টি নতুন নয়। ১৯২৮ সালেই মার্কিন গবেষক হ্যারিসন মার্টল্যান্ড বক্সারদের মধ্যে ‘পাঞ্চ ড্রাঙ্ক’ নামে পরিচিত এক ধরনের স্নায়ু সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। পরে এটি ডিমেনশিয়া পিউজিলিস্টিকা নামে পরিচিত হয়। শুরুতে ধারণা ছিল, সমস্যা শুধু বক্সিংয়েই সীমাবদ্ধ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জানা যায়, ফুটবল ও আমেরিকান ফুটবলেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
২০০২ সালে ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার জেফ অ্যাস্টলের অল্প বয়সে ডিমেনশিয়ায় মৃত্যু হয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান ফুটবলার মাইক ওয়েবস্টারও ৫০ বছর বয়সে মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যায় ভুগে মারা যান। তাঁদের দুজনের মস্তিষ্ক পরীক্ষায় ধরা পড়ে ক্রনিক ট্রমাটিক এনসেফালোপ্যাথি বা সিটিই। পরবর্তী সময়ে আরও অনেক খেলোয়াড়ের মধ্যেই একই রোগ শনাক্ত হয়।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোপ্যাথলজিস্ট উইলি স্টুয়ার্টের মতে, সিটিই এমন একটি রোগ, যা মূলত বারবার মাথায় আঘাত পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেই দেখা যায়। মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক ‘টাউ’ প্রোটিন জমে এই রোগ তৈরি হয়। তাঁর ভাষায়, কোনো সাবেক পেশাদার ফুটবলারের ডিমেনশিয়া হলে সিটিই থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যান ম্যাকি ২০০৮ সাল থেকে সাবেক ক্রীড়াবিদদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০২৩ সালে এনএফএলের ৩৭৬ জন সাবেক খেলোয়াড়ের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৯২ শতাংশের মধ্যেই সিটিই ছিল। যদিও এই হার পুরো খেলোয়াড় সমাজের প্রকৃত চিত্র নয়, তবু এটি ঝুঁকির মাত্রা স্পষ্ট করে।
সিটিই ছাড়াও ফুটবলারদের মধ্যে আলঝেইমার, পারকিনসন ও মোটর নিউরন ডিজিজের ঝুঁকিও বেশি। স্কটল্যান্ডে প্রায় ৮ হাজার সাবেক পেশাদার ফুটবলারের স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাঁরা সাধারণ মানুষের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি আলঝেইমারে, চার গুণ বেশি মোটর নিউরন ডিজিজে এবং দ্বিগুণ পারকিনসনে আক্রান্ত হন। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন ডিফেন্ডাররা, কারণ তাঁদের মাথা দিয়ে বল মারার হার বেশি। গোলকিপারদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল লিপটন এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে তরুণ শৌখিন ফুটবলারদের মস্তিষ্কেও ক্ষতির চিহ্ন পেয়েছেন। যাঁরা বছরে হাজারবারের বেশি হেড করেন, তাঁদের মস্তিষ্কের কপালের পেছনের অংশে সাদা ও ধূসর পদার্থের সংযোগস্থলে ক্ষতি বেশি দেখা যায়। মাথায় আঘাতের সময় মস্তিষ্কের ভেতরে হঠাৎ গতি পরিবর্তনের কারণে সূক্ষ্ম স্নায়ুতন্তু বা অ্যাকসন টেনে প্রসারিত হয় এবং সংযোগ নষ্ট হয়।
তবে সব খেলোয়াড়ই যে ভবিষ্যতে স্নায়ু রোগে আক্রান্ত হবেন, তা নয়। গবেষকদের মতে, জিনগত বৈশিষ্ট্য, জীবনযাপন ও আঘাতের সংখ্যা মিলিয়ে ঝুঁকি নির্ধারিত হয়। কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা রক্তনালির ক্ষতি ধীরে ধীরে রোগের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ঝুঁকি কমাতে প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে কাজ চলছে। উন্নত হেলমেট, আঘাত শোষণকারী উপকরণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে অনুশীলনে হেডিং কমানোকে কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে শিশু পর্যায়ে ফুটবলে হেডিং ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং অনুশীলনে হেডের সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো সমাধান। খেলাধুলার আনন্দ বজায় রেখেই কীভাবে মাথায় আঘাত কমানো যায়, সেটিই এখন বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া ও চিকিৎসা গবেষণার বড় চ্যালেঞ্জ।
















