ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূচনা হয় ডিসেম্বরের এক শীতল দিনে, যখন তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার ও জোমহুরি অ্যাভিনিউয়ের আশপাশের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রতিবাদ জানিয়ে দোকানপাট বন্ধ করে দেন। ক্রমাগত অবমূল্যায়নে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান এক বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় তারা প্রতিদিনই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছিলেন।
এই ক্ষোভ দ্রুতই রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থবির মজুরির চাপ থেকেই এসব প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে জনমত বোঝার সূচক হিসেবে বিবেচিত ইরানের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো পরিণত হয় অসন্তোষের মূল মঞ্চে।
পশ্চিম ইরানের আজনা, মালেকশাহি ও কেরমানশাহসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। দক্ষিণের মারভদাশত এবং মধ্যাঞ্চলের ফুলাদশাহরেও একই ধরনের আন্দোলন দেখা যায়। কোথাও কোথাও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানি, আহত ও বহু গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।
ইরানে অতীতেও একাধিকবার বড় ধরনের গণঅসন্তোষ দেখা গেছে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সালের ছাত্র ও সংস্কারপন্থী আন্দোলন, ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গ্রিন মুভমেন্ট কিংবা ২০২২-২৩ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন—এসবের মূল দাবি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার। তবে এবারের আন্দোলন তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক এবং বেশি অর্থনৈতিক সংকটকেন্দ্রিক।
দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতায় ইরানের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভুগছে শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যাদের জন্য দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে উঠেছে।
এবারের বিক্ষোভে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও অতীতের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার নির্দেশ দেন। সরকার জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন ভর্তুকি কাঠামো ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ঘোষণাও দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগকে মুদ্রা স্থিতিশীল করার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে সরকার অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বিদেশি চাপ ও হস্তক্ষেপের কথাও উল্লেখ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্য এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সমর্থনসূচক বক্তব্য তেহরানের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
এখনো পর্যন্ত এই বিক্ষোভগুলো আগের মতো দেশব্যাপী ব্যাপক রূপ নেয়নি, এবং কিছু শহরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় চাপ রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত ও কার্যকরভাবে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি দেখাতে না পারে, তাহলে এই আপাত শান্ত অবস্থা ভেঙে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
















