রাজনীতির হিসাব–নিকাশের বাইরে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের লড়াই
উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ সাধারণ মানুষের আয়–ব্যয়ের ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছে; পেটের ভাত, নিরাপত্তা আর স্বস্তির জীবনই এখন মানুষের প্রধান চাওয়া।
দেশের রাজনীতিতে জোট–পাল্টা জোট, ভোটের অঙ্ক আর সংস্কারের নানা ভাষ্য শোনা যাচ্ছে। টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে এসব আলোচনার ঘনঘটা থাকলেও সাধারণ মানুষের মুখে স্বস্তির হাসি নেই। কারণ রাজনীতির চেহারা বদলালেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট কমছে না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে স্বস্তি ফিরবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশা ভেঙে পড়েছে; নিত্যপণ্যের দাম কমেনি, আয়ও বাড়েনি।
খেটে খাওয়া মানুষের কাছে রাজনীতি মানে বড় বড় শব্দ নয়। রাষ্ট্রসংস্কার, নতুন বন্দোবস্ত কিংবা নীতিগত পরিবর্তনের ধারণা তাদের জীবনের তাৎক্ষণিক প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তাদের হিসাব খুব সোজা—আজ ঘরে চাল আছে কি না, কাল বাজারে গেলে ডাল কেনা যাবে কি না, সন্ধ্যায় সন্তান নিরাপদে ফিরবে কি না। একজন রিকশাচালক বা গার্মেন্টসকর্মীর কাছে রাজনীতি মানে দিনশেষে পেটের ভাত; একজন গৃহিণীর কাছে মাসের শেষ দশ দিনে রান্নাঘরের হিসাব মিলানো; একজন নিম্ন–মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর কাছে বাড়িভাড়া, স্কুল ফি আর বাজার খরচ একসঙ্গে সামলানো।
এই জায়গাতেই সরকারের বড় ব্যর্থতা—মানুষের ন্যূনতম নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে না পারা। খুন, ছিনতাই, মব–সন্ত্রাসের ভয় কাটেনি। তার ওপর নিত্যপণ্যের চড়া দাম সংসারকে আরও চাপে ফেলেছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ–মাংস—সবকিছুর দাম আগের মতোই বেশি; কোথাও কোথাও আরও বেড়েছে। অথচ আয় স্থির। যে পরিবার আগে ৩০ হাজার টাকায় কোনোমতে মাস চালাত, এখন ৪০ হাজার টাকাতেও হিমশিম খাচ্ছে। টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষ প্রতিদিনই টের পাচ্ছে—আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার হতো, এখন তিন–চার দিনের বেশি চলে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সপ্তাহে একদিন মাছ, একদিন মাংসের হিসাব করছে; কেউ কেউ সেটাও বাদ দিচ্ছে।
এ অবস্থায় বড় সংস্কারের ভাষ্য সাধারণ মানুষের কানে অনেক সময় প্রহসনের মতো শোনায়। খালি পেটে সংস্কারের গল্প স্বস্তি দেয় না। সন্তানের স্কুল ফি দিতে না পারা বাবা–মায়ের কাছে নীতিগত পরিবর্তন অর্থহীন লাগে।
সরকারি পরিসংখ্যানও এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানায়, ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি টানা তিন মাস ধরে বাড়ছে—যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক, কারণ খাদ্যই তাদের ব্যয়ের বড় অংশ। গত এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নামতে পারেনি—এটি ‘স্টিকি ইনফ্লেশন’ বা আটকে থাকা মূল্যস্ফীতির লক্ষণ। বাজারে দাম বাড়া যেন নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ বছরজুড়েই মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে শুধু ভোগ কমে না—সঞ্চয় ভাঙে, ঋণ বাড়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্যের দাম বড় আঘাত হলেও মধ্যবিত্তের জন্য এখন খাদ্যবহির্ভূত খরচ—শিক্ষা, বাসাভাড়া, যাতায়াত—সবচেয়ে বড় বোঝা। ফলে সমাজে এক ধরনের ‘নীরব সংকট’ তৈরি হচ্ছে, যা পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
বিবিএসের হিসাব বলছে, ডিসেম্বর মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৮ শতাংশ—যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। অর্থাৎ কাগজে–কলমে আয় বাড়লেও বাস্তবে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এই অবস্থায় মূল্যস্ফীতি এক ধরনের অঘোষিত করের মতো কাজ করছে। কর না বাড়লেও বাজারের দামের মাধ্যমে মানুষের পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ—সরকারি কর্মচারী, বেসরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী, দিনমজুর—এই চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
আরেকটি হিসাব পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়। এক বছর আগে কোনো পরিবার যদি মাসে ১ লাখ টাকা খরচে সংসার চালাত, এখন একই জীবনযাত্রা বজায় রাখতে তাদের প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ৪৯০ টাকা প্রয়োজন। এই অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করতে কেউ সঞ্চয় ভাঙছে, কেউ ধার করছে, কেউ পুষ্টিকর খাবার কমাচ্ছে—যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানবসম্পদ ও সামাজিক স্থিতির জন্য ক্ষতিকর।
মূল্যস্ফীতির পেছনে বৈশ্বিক কারণ যেমন আছে, তেমনি দেশের কাঠামোগত দুর্বলতাও দায়ী। সরবরাহব্যবস্থার অকার্যকারিতা, পরিবহন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, বিনিময় হার চাপ, আমদানিনির্ভরতা—সব মিলিয়ে দাম কমার সুযোগ সীমিত। সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমানোর চেষ্টা হলেও তা পুরোপুরি ফল দিচ্ছে না; উল্টো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার বললেও ফল এখনও সীমিত। কারণ মূল্যস্ফীতি কেবল মুদ্রানীতির বিষয় নয়; রাজস্বনীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বয় দরকার। একদিকে সরবরাহ শক্তিশালী ও বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। মজুরি ও আয়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সমন্বয় ঘটানোও জরুরি।
ডিসেম্বরের ৮.৪৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কোনো সংখ্যা মাত্র নয়—এটি লাখো পরিবারের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক আস্থাও দুর্বল হবে। রাষ্ট্রের জন্য এটি নীতির বড় পরীক্ষা। মানুষ রাজনীতির নাটক নয়—চায় পেটের ভাত, নিরাপত্তা আর একটু স্বস্তির জীবন। এই সহজ চাওয়াগুলো পূরণ না হলে যত বড় জোটই হোক, যত বড় পরিকল্পনাই থাকুক—সাধারণ মানুষের কাছে তা মূল্যহীনই থেকে যাবে।















