ওয়াশিংটন ডিসি থেকে বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন এক দীর্ঘ সংকটের গল্প শুনছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরটি ইতিহাসে রয়ে গেল জরুরি অবস্থা, আক্রমণের ভাষা আর মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগে মোড়ানো এক সময় হিসেবে।
২০ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার পরই রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের উত্তাপে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, দেশ ভয়াবহ বিপদের মুখে। তাঁর ভাষ্যে কখনো সীমান্তে অভিবাসীদের আক্রমণ, কখনো বাণিজ্য চুক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, আবার কখনো মাদককে গণবিধ্বংসী অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরে সামরিক অভিযান। তাঁর চোখে ২০২৫ ছিল সর্বক্ষণিক সংকটের বছর।
অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্প সীমান্ত পারাপারকে সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত বলে ঘোষণা দেন। সেই যুক্তিতে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার স্থগিত করা হয়, সীমান্তে সেনা মোতায়েন বাড়ানো হয় এবং ফেডারেল জমি দখলে নেওয়া হয়। একই দিনে তিনি আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় কিছু লাতিন আমেরিকান গ্যাংকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রশাসনের ভাষায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি।
এই ঘোষণাগুলো শুধু কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যাপক বহিষ্কার অভিযান, বিচার প্রক্রিয়া এড়িয়ে সিদ্ধান্ত, এমনকি লাতিন আমেরিকার প্রতি কঠোর সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির পেছনেও এগুলো যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে পরিবেশগত বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর পথও তৈরি হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রেসিডেন্টের জন্য সার্বিক জরুরি ক্ষমতার কোনো সরাসরি অনুমোদন নেই। তবু কংগ্রেসের দেওয়া কিছু সীমিত আইনের বিস্তৃত ব্যাখ্যা করে ট্রাম্প প্রায় পুরো নীতিগত এজেন্ডাকেই জরুরি অবস্থা বলে চালিয়ে দিয়েছেন। অনেকের চোখে এটি ছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার এক অভূতপূর্ব পরীক্ষা।
শুধু জরুরি আইন নয়, ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী ক্ষমতার ব্যাখ্যায় আরও দূর পর্যন্ত হেঁটেছে। সরকারি দপ্তর পুনর্গঠন, স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের অপসারণের চেষ্টা, নিজের নাম জুড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান পুনর্নামকরণ এবং এমনকি হোয়াইট হাউসের ভৌত রূপান্তর নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। ভেনেজুয়েলা উপকূলে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌকায় মার্কিন হামলা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনা ডেকে আনে। প্রশাসনের দাবি, নিহতদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। প্রমাণের অভাব থাকলেও ট্রাম্প সরকার মাদককে জাতীয় অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে তুলে ধরে।
কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বড় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। নিম্ন আদালত কিছু ক্ষেত্রে লাগাম টানলেও সর্বোচ্চ আদালত অনেক প্রশ্ন খোলা রেখেছে। কোথাও ট্রাম্পের পদক্ষেপ আটকে গেছে, কোথাও আবার সীমিত শর্তে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি মিলেছে।
জনমতও একরকম নয়। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, অর্ধেকের বেশি ভোটার মনে করেন ট্রাম্প ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। আবার বড় একটি অংশ বিশ্বাস করেন, তিনি সঠিক পথেই হাঁটছেন। অনুমোদনের হার কমলেও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব অটুট।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রশ্ন একটাই। এই জরুরি ভাষা, এই ক্ষমতার বিস্তার কি ভোটারদের মন জয় করবে, নাকি ভয়ের জন্ম দেবে। ২০২৫ শেষ হয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অনিশ্চয়তার গল্প এখনো লেখা বাকি। ট্রাম্পের জরুরি অবস্থার রাজনীতি দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেই উত্তর আপাতত সময়ের হাতে।
















