চীনের রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দেশটির অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশের বাজারে চীনা পণ্যের আধিপত্য বাড়ায় বাণিজ্যিক বিরোধ, শিল্প সুরক্ষা এবং চীনের বিরুদ্ধে নতুন বাণিজ্যিক বাধা তৈরির আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। তবে চীনা ভাষার সংবাদমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী মহলের আলোচনায় ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে আশঙ্কা করা হচ্ছে, চীনের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দেশটির বন্ধু ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করছে।
চীনের সামনে ফিরে এসেছে পুরোনো বাণিজ্যিক ধাক্কা
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্যিক চাপের বিষয়টি জড়িয়ে আছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার পর দুই হাজারের দশকের শুরুতে চীনের সস্তা পণ্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যাপকভাবে প্রবেশ করে। পোশাক, বস্ত্র, খেলনা, আসবাব ও ইলেকট্রনিক পণ্যের মতো শ্রমনির্ভর শিল্পে চীনের আধিপত্য বাড়ে।
এর ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দেশে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হয়। সেই সময়ের বাণিজ্যিক ধাক্কাকে নতুন করে আরও বড় পরিসরে ফিরে আসতে দেখা যাচ্ছে। তবে এবার চীনের রপ্তানির কেন্দ্রে রয়েছে উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য।
বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, রোবটসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য এখন ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশের বাজারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে চীনা পণ্যের ওপর বিভিন্ন শুল্ক ও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে নতুন এই বাণিজ্যিক চাপের প্রভাব ইউরোপে তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য ঘাটতিও দ্রুত বেড়েছে। দুই হাজার পঁচিশ সালে ইউরোপের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় তিনশ ঊনষাট বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছায়। এর প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছে জার্মানির ওপর।
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানির গাড়ি ও প্রকৌশল শিল্প চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের প্রথম পাঁচ মাসে চীনে জার্মান গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিপরীতে ইউরোপের বাজারে চীনা গাড়ির বিক্রি বেড়েছে।
চীনের নতুন বাণিজ্যিক চাপ
চীনের উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী শ্রমনির্ভর শিল্পেও দেশটির শক্ত অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মতে, চীন একদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সৌর প্রযুক্তি ও ড্রোনের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে নেতৃত্ব দিতে চাইছে, অন্যদিকে পোশাক, জুতা ও ইলেকট্রনিক পণ্য সংযোজনের মতো পুরোনো শিল্পও ধরে রাখছে।
এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিল্পায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অনেক দেশ পোশাক, খেলনা, জুতা, আসবাব ও ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু চীন একই সঙ্গে উচ্চপ্রযুক্তি ও শ্রমনির্ভর উভয় ক্ষেত্রেই বড় অংশ ধরে রাখায় অন্য দেশগুলোর জন্য বাজার তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চীনা পণ্যের প্রতিযোগিতা এখন শুধু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারেও সস্তা চীনা পণ্যের প্রবেশ বাড়ছে। এতে স্থানীয় শিল্প ও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতার চাপে পড়ছে।
অন্যদিকে চীনের বাজারে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমনির্ভর পণ্য প্রবেশের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে যেসব দেশ চীনের বাজারকে নিজেদের রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখেছিল, তারাও প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দেশটির এই বাণিজ্যিক নীতিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে চীনের চাপ তত্ত্ব। এর মূল বক্তব্য হলো, চীন একই সঙ্গে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের শিল্প ও বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়েও চীনে উদ্বেগ
চীনের বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দেশটির অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে দেশের ভেতরেই এখন প্রশ্ন উঠছে, এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই।
চীনের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের কয়েকজন মনে করছেন, একটি দেশের জন্য বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবসময় আশীর্বাদ নয়। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিপুল উদ্বৃত্ত অন্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
চীনা অর্থনীতিবিদ চাং ইয়ানশেং মনে করেন, চীনের অর্থনৈতিক কৌশলে জয়ী পক্ষ সবকিছু নিয়ে নেবে—এমন অবস্থান থেকে সরে এসে লাভ ভাগাভাগির দিকে যেতে হবে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো, মুদ্রার মূল্য কিছুটা বাড়ানো, রপ্তানি প্রণোদনা কমানো, আমদানি শুল্ক কমানো এবং বিদেশে কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ হুয়াং ছিফান এবং গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ওয়াং ছুয়ানফুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও একই ধরনের মতামত দিয়েছেন।
তবে অর্থনীতির ভারসাম্য ফেরানো সহজ নয়
চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে মুদ্রার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো বা রপ্তানি প্রণোদনা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার মতো পদক্ষেপের বিরোধিতাও রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে সম্পদের মূল্যে অস্থিরতা, মূলধন পাচার, রপ্তানি খাতে ক্ষতি এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। এর ফলে দেশের ভেতরের শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন কেউ কেউ।
ফলে কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা দূর করার বদলে চীন এখনো রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে। বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখাই আপাতত দেশটির অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এই নীতি অব্যাহত থাকলে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে সমন্বিত বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার চাপও তৈরি হতে পারে।
চীনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ধরে রাখা নয়, বরং সেই উদ্বৃত্তের কারণে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে তৈরি হওয়া অসন্তোষ সামাল দেওয়া। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ না নিলে চীনের অর্থনৈতিক শক্তিই ভবিষ্যতে দেশটির জন্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
















