যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পরমাণু নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের নীতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। চুক্তিতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ থেকে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রটোকল গ্রহণের শর্তও নেই। ফলে আগের কিছু চুক্তির তুলনায় সৌদি আরবকে তুলনামূলক বেশি সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে জুলাই মাসে। এর আওতায় সৌদি আরবে বেসামরিক পরমাণু অবকাঠামো গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দেশটির নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদন করা হয়নি। এ বিষয়ে দুই বছর ধরে একটি বাণিজ্যিক ও কারিগরি সমীক্ষা চালানোর কথা রয়েছে। সমীক্ষায় সৌদি আরবে সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হলে বিশেষ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় স্থাপনা তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই ব্যবস্থায় সৌদি আরব স্থাপনাটি পরিচালনা করলেও সংবেদনশীল প্রযুক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অতীতে এ ধরনের ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন দেশে পরমাণু প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মালিকানা ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ আলাদা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি দুর্বল হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চুক্তি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচিকে সামরিক ব্যবহারের বাইরে রাখার কথা বলেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আঞ্চলিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার শর্তও সামনে আসে। তবে এই শর্ত চুক্তি ঘোষণার সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে অনাগ্রহী।
চুক্তিটি এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য পাঠানোর কথা রয়েছে। ফলে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
এই চুক্তির তুলনা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার আগের পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির সঙ্গে। ওই চুক্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পরমাণু জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রটোকলও গ্রহণ করেছিল। এই ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে পরমাণু বিস্তার রোধের একটি কঠোর মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সৌদি আরব সেই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেনি। দেশটি আগে থেকেই নিজস্ব পরমাণু জ্বালানি চক্রের অধিকতর সক্ষমতা অর্জনের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। ফলে নতুন চুক্তিতে সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ না থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও ভবিষ্যতে একই ধরনের সুযোগ দাবি করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরমাণু বিস্তার রোধের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইরানের কারণে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বও অতীতে জানিয়েছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র অর্জনের দিকে এগোলে রিয়াদও তার নিরাপত্তা নীতি পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
ফলে সৌদি আরবের জন্য ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথ খোলা থাকলে ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মাত্রা তৈরি হতে পারে। ইসরায়েলের জন্যও এটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক দেশের পরমাণু সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে সৌদি আরবের নিজস্ব পরমাণু জ্বালানি চক্র গড়ে তোলার সক্ষমতা সীমিত। দেশটির নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলেও পরমাণু জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের পুরো অবকাঠামো তৈরি করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। ফলে বর্তমান উদ্বেগ মূলত ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সক্ষমতা ও নীতিগত পথ খোলার বিষয়কে কেন্দ্র করে।
চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বিস্তার রোধ নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন। ইরানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে একই বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু নীতিতে কৌশলগত স্বার্থের প্রভাব কতটা কাজ করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতা শুধু পরমাণু নিরাপত্তার বিষয় নয়। মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করা, সৌদি আরবকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করাও এর সঙ্গে জড়িত।
এই পরিবর্তনের প্রভাব ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চল ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিপুলসংখ্যক প্রবাসী নাগরিকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান—তিন দেশের সঙ্গেই ভারতের অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পরমাণু প্রতিযোগিতা বাড়লে ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থও প্রভাবিত হতে পারে।
ভারত নিজেও আন্তর্জাতিক পরমাণু ব্যবস্থায় একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে। পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির বাইরে থেকেও দেশটি আন্তর্জাতিক পরমাণু সহযোগিতা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরমাণু ব্যবহারে দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক নীতি অনুসরণ করে আসছে।
সৌদি আরবের জন্য তুলনামূলক নমনীয় পরমাণু সহযোগিতার নজির তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও একই ধরনের সুবিধা পাওয়ার দাবি তুলতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য পরমাণু জ্বালানি চক্রের সক্ষমতা অর্জনে আগ্রহী, তারা এই চুক্তিকে একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি পরমাণু চুক্তির তাৎক্ষণিক প্রভাবের চেয়ে এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি পরমাণু সহযোগিতার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ নিয়ে আগের কঠোর মানদণ্ড শিথিল হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা নতুন গতি পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি এখনো সৌদি আরবকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা দেয়নি। তবে ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ না রেখে যে পথ তৈরি করা হয়েছে, সেটিই মূল উদ্বেগের বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্যে এই নমনীয়তা ভবিষ্যতে বড় কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।















