তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, রাজনীতির নতুন অধ্যায় ও সামনে কঠিন পরীক্ষা
দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করেছে। এই প্রত্যাবর্তন জাতিকে আশাবাদী করলেও সামনে রয়েছে জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা, কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও নেতৃত্বের কঠিন পরীক্ষা।
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫,
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫—এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে তারেক রহমান–এর দেশে ফেরা বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে যেমন নতুন আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি পুরো জাতির মধ্যেও একটি রক্তিম প্রভাতের অনুভূতি তৈরি করেছে। কিছু প্রত্যাবর্তন কেবল ঘরে ফেরা নয়, ইতিহাসের বাঁকবদল—তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন তেমনই এক ঘটনা।
এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর নেতা-কর্মীরা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন। তবে রাজনীতি কখনোই কেবল গোলাপের পথ নয়—প্রতিটি সম্ভাবনার সঙ্গেই যুক্ত থাকে কঠিন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ।
ঢাকায় এক বিশাল সমাবেশে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান। তিনি আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য। পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে সবাই সমান মর্যাদা পাবে—এই অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে তিনি ন্যায় ও সমতার রাজনীতির বার্তা দেন।
ভাষণে তিনি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের, বিশেষ করে শহীদ ওসমান হাদিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতা বিপ্লবের গুরুত্বও তুলে ধরেন। তারেক রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল—গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে এবং যুবসমাজকে শান্ত, ধৈর্যশীল ও সতর্ক থাকতে হবে।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনীতি এখন এক নতুন সমীকরণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী শক্তি, অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–সহ বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক শক্তি—এরা আগামী নির্বাচনে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। ইসলামি রাজনীতির উত্থান এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ওপর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাপ—এই দুই বাস্তবতা আগামী দিনের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে কূটনীতি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও পাকিস্তান—এই চার শক্তিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি রক্ষা করা আগামী সরকারের জন্য সহজ হবে না, তবে বিকল্পও নেই। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দক্ষ কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন একটি বড় বিভাজন স্পষ্ট—ভারতবিরোধী ও ভারতপন্থি অবস্থান। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ভারতপন্থি রাজনীতির প্রভাব কমেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই বাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দলই জনগণের আবেগ ও অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না।
তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—তিনি কি কেবল আশার কথা বলবেন, নাকি কার্যকর নেতৃত্ব দিয়ে সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দেবেন। প্রস্তুত পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া তারেক রহমানের জন্য একটি বড় পুঁজি।
এখন জাতি অপেক্ষা করছে—এই রক্তিম প্রভাত কি কেবল আবেগেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি একটি অর্থবহ ভবিষ্যতের ভিত্তি রচনা করবে। তারেক রহমান ও তাঁর দলের সামনে সময় কম, প্রত্যাশা অনেক। প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা সত্যিই বাংলাদেশের মানুষের জন্য সর্বোত্তম বিকল্প।















