এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ; আমানত বাড়লেও বিনিয়োগে স্থবিরতায় গভীর সংকটের আশঙ্কা
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্যাংক খাত এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট এবং পাহাড়সম খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনী বছরে পা রাখতে যাচ্ছে এই খাত। বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর আস্থার সংকট কাটাতে না পারলে আগামী বছর ব্যাংক খাতের জন্য আরও বড় বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় আর্থিক স্থিতিশীলতা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। মাত্র এক বছর আগে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ব্যাংকের অবস্থা এতটাই নাজুক যে তাদের অর্ধেকের বেশি ঋণই এখন আদায় অযোগ্য।
ছয় ব্যাংকের অবস্থা আশঙ্কাজনক
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, দেশের ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান: ৯৯.৮৪%
- ইউনিয়ন ব্যাংক: ৯৬.৬৪%
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক: ৯৬.২০%
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক: ৯৫.৭০%
- পদ্মা ব্যাংক: ৯৪.১৭%
- আইসিবি ইসলামী ব্যাংক: ৯১.৩৮%
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে তা বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা দেয়। কিন্তু বর্তমানে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.২৩ শতাংশে নেমেছে। বিনিয়োগ ছাড়া শুধু আমানত সংগ্রহ ব্যাংকের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।”
অনিশ্চয়তা: অর্থনীতির প্রধান শত্রু
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুল বায়েস মনে করেন, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, “বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে নতুন কোনো উদ্যোগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না কারণ সামনে কী হবে তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। এই অনিশ্চয়তা কাটানোর একমাত্র পথ হলো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। একটি নির্বাচিত সরকার থাকলে মানুষ অন্তত জানবে আগামী পাঁচ বছর দেশ কোন পথে যাবে।”
সংস্কারের চ্যালেঞ্জ ও ২০২৬ সালের পূর্বাভাস
ব্যাংক খাতের ক্ষত সারাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করলেও তার সুফল পেতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম. হেলাল আহমেদ জনি বলেন, “বিগত বছরগুলোর অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে আমানতকারীদের আস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৬ সালে এই খাত পুরোপুরি সংকটমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে সংস্কার কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে স্থিতিশীলতার পথে এগোনো সম্ভব হবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সাল হবে ব্যাংক খাতের জন্য একটি ‘রূপান্তরকাল’। যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করে বড় বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা যায়, তবেই ব্যাংক খাতে আবার সুবাতাস ফিরবে। অন্যথায়, তারল্য সংকট ও অনাদায়ী ঋণের বোঝা পুরো অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারে।
















